Image description
জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সন্তুষ্ট নয় বিএনপি ও জামায়াত, বেশকিছু সীমানা নিয়ে আপত্তি

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮-১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের খসড়া সীমানা নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর থানা নিয়ে গঠিত এ আসনের জনসংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার এবং ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৪ হাজার ৩২৯ জন। পক্ষান্তরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১, ১৭, ৪৩-৫৪ ও বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৮ আসনের জনসংখ্যা ১৩ লাখ ২৮ হাজার এবং ভোটার ৬ লাখ ১১ হাজার।

ঢাকার ২০টি আসনের প্রতিটিতে গড় জনসংখ্যা ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৭০১ জন ও গড় ভোটার ৪ লাখ ২২ হাজার ৭৩। এই হিসাবে ঢাকার গড় জনসংখ্যার চেয়ে ৫০ শতাংশ এবং ভোটার ৩৫ শতাংশ কম নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের সীমানা নির্ধারণ করেছে ইসি। অপরদিকে ঢাকা-১৮ আসনে গড়ের চেয়ে ৮০.৩৮ শতাংশ জনসংখ্যা এবং ৪৪.৭৬ শতাংশ ভোটার বেশি রয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা-৮ আসনের প্রায় চারগুণ জনসংখ্যা রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনে।

জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার বিশাল ব্যবধান রেখে সংসদীয় আসনের সীমানার খসড়া প্রকাশ করেছে ইসি। ইসির তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। জানা গেছে, শুধু এ দুটি আসন নয়, এমন অনেক সংসদীয় আসন আছে যেখানে এক আসনের চেয়ে আরেক আসনের জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার বড় ব্যবধান রয়েছে। কোথাও কোথাও জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার বড় ব্যবধান কমাতে গিয়ে প্রশাসনিক সুবিধা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। একই উপজেলাকে দুই সংসদীয় আসনের মধ্যে বিভাজনও করার ঘটনা ঘটেছে। যদিও এবার সীমানা পুনর্নির্ধারণে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করা হয়েছে। ওই টুলসের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা, যা বিগত নির্বাচনগুলোতে এ খাতে সর্বোচ্চ। শুধু তাই নয়, সীমানা পুনর্নির্ধারণের শেষ পর্যায়ে এসে ওই টুলস ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যাচ্ছেন ইসির সাত কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের চাপের মুখে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। খসড়া সীমানা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। দুটি দলের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে বেশকিছু আসনের সীমানা নিয়ে ইসিতে আপত্তি জানিয়েছে। এছাড়া খসড়া সীমানা নিয়ে ইসির সামনে বেশ কয়েকদিন ধরে মানববন্ধন করেছেন বিভিন্ন আসনের সম্ভাব্য সংসদ-সদস্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা। কুমিল্লার দুটি আসনের সীমানা পরিবর্তন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের একজন উপসচিবের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ জমা পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৩ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের শুনানিতে মারামারির ঘটনাতেও বিব্রত ইসি। এতে ইসির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। এই অবস্থায় সীমানা চূড়ান্ত করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে ইসি। ১৫ সেপ্টম্বরের মধ্যে সীমানা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।

নির্বাচন কমিশনার ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিটির প্রধান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার শুক্রবার যুগান্তরকে জানান, সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইনের কারণে সব আসনের জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও প্রশাসনিক অখণ্ডতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আইনটাই এরকম। প্রশাসনিক সুবিধা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা- এই তিনটি বিষয়ের কোনোটিতে এককভাবে স্থির থাকা সম্ভব নয়। এরপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছি।

জাতীয় সংসদের ৪০টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে ৩০০টি আসনের খসড়া তালিকা ৩০ জুলাই প্রকাশ করেছে ইসি। গত সপ্তাহে ৮২ আসনের ওপর ৪ দিন ইসিতে শুনানি হয়। এতে খসড়া আসনের বিপক্ষে ১১৮৫টি ও পক্ষে ৭০৮টি শুনানি হয়। ইসি যে ১২টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংসদীয় আসনের খসড়া সীমানা তৈরি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক সুবিধা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা যতদূর সম্ভব রক্ষা করা হয়েছে। জেলার মধ্যকার ভোটার সংখ্যার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যবধানে সীমাবদ্ধ রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে অনেক আসনে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা না করা, জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার বড় ব্যবধান থাকায় বিষয়টি শুনানিতে উঠে আসে।

জনসংখ্যার বিস্তর ব্যবধান : জানা গেছে, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক এড়াতে বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে ইসি সচিবালয়। প্রথমে ২০০১ সালের আদলে সীমানা নির্ধারণ করতে সম্ভাব্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়। সেখানে কমবেশি ৭০টি আসনের সীমানায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়। সেখানে ঢাকার আসন কমিয়ে গ্রামের আসন বাড়ানোর কথা উল্লেখ ছিল। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফায় আলোচনার মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ ও ইসি সচিবালয়ের প্রস্তাব সমন্বয় করে ৪০টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনা হয়। এতেও জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যায় সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি ইসি। কোথাও কোথাও জনসংখ্যার সমন্বয় করতে গিয়ে উপজেলাকে ভেঙে দুই আসনে ভাগ করে দিয়েছে।

ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ঢাকা-২, ৩, ৭, ১০, ১৪ ও ১৯ আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনেছে ইসি। জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা বিবেচনায় কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার প্রশাসনিক অখণ্ডতা রক্ষা হয়নি। ফলে এ দুটি উপজেলায় একজন করে উপজেলা চেয়ারম্যান হবেন। আর সংসদ-সদস্য হবেন দুজন করে। অপরদিকে ঢাকা-৪ আসনে জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮ হাজার, ঢাকা-৬ আসনে জনসংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার, ঢাকা-৮ আসনে ৩ লাখ ৬৯ হাজার, ঢাকা-১২ আসনে জনসংখ্যা ৪ লাখ ৪৮ হাজার হলেও এসব আসনের সীমানায় পরিবর্তন করেনি ইসি। এই চারটি আসনের ভোটার সংখ্যাও কম। ঢাকার গড় জনসংখ্যার চেয়ে ঢাকা-৪ আসনে ৪৫ শতাংশ, ঢাকা-৬ আসনে ৪৩ শতাংশ, ঢাকা-৮ আসনে ৫০ শতাংশ ও ঢাকা-১২ আসনে ৩৯ শতাংশ কম জনসংখ্যা রয়েছে। অথচ অন্য আসনগুলোতে জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা অনেক বেশি।

গাজীপুর উপজেলায় একটি আসন বাড়ানোর পরও সেখানে জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার সামঞ্জস্যতা ও প্রশাসনিক অখণ্ডতা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি ইসি। কালিয়াকৈর উপজেলা ও গাজীপুর সিটির ১২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর-১ আসনের ভোটার ১৩ লাখ ৪৩ হাজার, যা ওই জেলার গড়ের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বেশি। অপরদিকে গাজীপুর সিটির কিছু অংশ বাদ দিয়ে শুধু কালীগঞ্জ উপজেলাকে একটি আসন করায় সেখানে বর্তমানে জনসংখ্যা রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ১০ হাজার ৯৪৩ জন আর ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার ৪১ জন। পাশাপাশি গাজীপুর সিটির ৩৪ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে নতুন গঠিত গাজীপুর-৬ আসনের জনসংখ্যা ১১ লাখ ৫৭ হাজার। একই জেলার ছয়টি আসনের জনসংখ্যাতেও বড় ব্যবধান রয়েছে।

এদিকে ভোটার ও জনসংখ্যার সমন্বয় করতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের বিজয়নগর উপজেলাকে ভেঙে দিয়েছে কমিশন। বিজয়নগর উপজেলার বুধস্তি, চান্দুরা ও হরষপুর ইউনিয়ন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই তিনটি ইউনিয়ন যুক্তের ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জনসংখ্যা ৬ লাখ ৯০ হাজার ও ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে ৮ লাখ ৫২ হাজার জনসংখ্যা ও ৫ লাখ ৮৫ হাজার ভোটার রয়েছেন, যা ওই জেলার গড়ের চেয়ে বেশি। বিজয়নগর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ আরেক আসনে নেওয়ার ঘটনায় শুনানিতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপির একাংশ ও এনসিপি নেতা আতাউল্লাহর মারামারি হয়।

কুমিল্লা-১, ২, ৯, ১০ ও ১১ আসনের সীমানায় পরিবর্তন এসেছে। এই ঘটনায় ইসির সামনে কয়েকদিন মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কুমিল্লা-২ আসনের হোমনা-মেঘনা নাগরিক সমাজের ব্যানারে কুমিল্লা-২ আসনের সীমানা পরিবর্তনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন উপসচিব প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে ইসিতে অভিযোগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। যদিও ওই কর্মকর্তা এ আসনের সীমানা পরিবর্তনে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেছেন।

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, তারা ২০০১ সালের আদলে ফেরার জন্য ইসিকে অনুরোধ জানিয়েছেন। সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ বেশকিছু জেলার আসন নিয়ে দলীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ইসিকে দেওয়া হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে দলটির প্রতিনিধিদের আবারও সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর সূত্র জানিয়েছে, তারা ২৫-৩০টি আসনের সীমানার বিষয়ে দলীয় অবস্থান সিইসিকে জানিয়েছেন। ইসি খসড়া সীমানার কিছু আসনে পরিবর্তন করবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন।