
ঝুলে যাচ্ছে বহু কাঙ্ক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’! সনদের দুটি বিষয় নিয়ে জটিলতা আছে। প্রথমত, নির্বাচনের আগেই সনদের আইনি ভিত্তি। দ্বিতীয়ত, নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন। অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব কমেনি। কোনো দল ছাড় দেবে সে ইঙ্গিত মেলেনি। রাজনৈতিক দলগুলো সমন্বিত খসড়ার ওপর যে মতামত দিয়েছে, সেখানে প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। ঐকমত্যে না এসে রাজপথের হুমকি দিচ্ছে দলগুলো। এক্ষেত্রে নিজেদের পক্ষ ভারী করতে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ফলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও আইনি ভিত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়, ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জুলাই সনদ ঘোষণা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ দলগুলোর দূরত্ব কমাতে তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আজ বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ ঝুলে যাবে কিনা তা আমি বলতে পারব না। এটি আপনাদের বিশ্লেষণ। তবে আমাদের জায়গা থেকে কাজ করছি। তিনি বলেন, সনদের সমন্বিত খসড়ার ওপর রাজনৈতিক দলগুলো মতামত দিয়েছে। সেই মতামত সমন্বয় করা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে দু-একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছি। আগামীকাল (রোববার) এবং পরশু (সোমবার) আরও দু-একটি দলের সঙ্গে বৈঠক হবে। সেই বৈঠকের আলোকে দু-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠাব। এরপর পরবর্তী আলোচনা। মতবিরোধের ইস্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মতামত পেয়েছেন কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কিছু প্রত্যাশা করিনি। উনাদের মতামত চেয়েছিলাম। উনারা মতামত তুলে ধরেছেন। সেই মতামত পর্যালোচনা করে আবার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হবে। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি বলেন, আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি। যতদিন আমাদের মেয়াদ আছে, সে পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব। বিকল্প কী করার আছে তা নিয়ে আলোচনা হবে। আপনাদের মেয়াদ অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশা করছি। দেখা যাক কী হয়।
‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’র সমন্বিত খসড়া ১৬ আগস্ট ৩০টি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠায় ঐকমত্য কমিশন। খসড়ায় তিনটি অংশ আছে। প্রথম অংশে সনদের পটভূমিতে ৫টি প্রস্তাবনা, দ্বিতীয় অংশে ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি সিদ্ধান্ত এবং তৃতীয় অংশে আছে ৮টি অঙ্গীকার। আবার ঐকমত্য হওয়া ৮৪টির মধ্যে ১৪টিতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। এই খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়। এক্ষেত্রে ২৯টি দল মতামত জমা দিয়েছে। এই মতামতের ওপর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ফের আলোচনা করেছে কমিশন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। তবে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলো যার যার অবস্থানে এখনো অনড়। এ অবস্থায় সংকট নিরসনে ৪টি বিকল্প দেখছে ঐকমত্য কমিশন। এগুলো হলো-গণভোট, সুপ্রিমকোর্টের মতামত, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ ব্যবস্থা ও অধ্যাদেশ জারি। সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় তা উল্লেখ থাকবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের আলোকে সনদে ভাষাগত ও অঙ্গীকারনামায় কিছু পরিবর্তন করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যেও বৈঠক করেছে। জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিস সনদের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি চায়। তাদের দাবি, সনদের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। অপরদিকে বিএনপি ও সমমনা দল চায় সাংবিধানিক সংস্কার নির্বাচিত সরকার করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সনদের ৮৪টি সুপারিশ বাস্তবায়নের তিনটি আইনি দিক রয়েছে। প্রথমত, বেশকিছু সুপারিশ নির্বাহী আদেশ দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে আইন পরিবর্তন বা নতুন আইন করতে হবে। তৃতীয়ত, মৌলিক সুপারিশ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে। এসব কারণে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি। বিএনপি বলছে নির্বাচিত সরকার ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব নয়। ফলে পরবর্তী সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি বলছে, নির্বাচনের আগে সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নির্বাচন হতে হবে সনদের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে সনদের একটি সুপারিশে বলা আছে, সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর (আনুপাতিক ভোট) পদ্ধতিতে সদস্য নির্বাচিত হবেন। বিএনপি এক্ষেত্রে আপত্তি দিয়েছে। তারা উচ্চকক্ষেও পিআর চায় না। তবে জামায়াত এবং এনসিপি শুধু উচ্চকক্ষেই নয়, নিম্নকক্ষেও পিআর চায়। সেখান থেকে এক জায়গায় আসা কঠিন। এক্ষেত্রে ন্যূনতম ঐক্যে আসতে সময় লাগবে। আবার সনদ চূড়ান্ত হলেও সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা বাস্তবায়ন নিয়ে। বিশেষ করে যে সব মৌলিক বিষয়ে আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা একেবারেই কম। অর্থাৎ এগুলো কাগজেই আটকে থাকবে। আর যেগুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর আইনি ভিত্তি না পেলে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রটি এসব বিষয় নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সনদ চূড়ান্ত করতে চায়। এক্ষেত্রে সময় আছে ১১ কার্যদিবস।
এদিকে খসড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এর মধ্যে আছেন-আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এমএ মতিন, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন এবং ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক। জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বিত খসড়ায় ৮৪টি সিদ্ধান্তের মধ্যে মৌলিক ১৪টি বিষয়ে আপত্তি দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে রয়েছে-প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে না থাকা, তত্ত্বাধায়ক সরকারের গঠন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, আইনসভার উচ্চকক্ষে পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বেশি আপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সমমনা কয়েক দল। এর মধ্যে ৯টি আপত্তি রয়েছে। ৪টিতে আপত্তি দিয়েছে সিপিবি ও বাম দল, ১টিতে জামায়াতে ইসলাম এবং ২টি অন্যান্য ইসলামি দল। এর মধ্যে আবার কমন আপত্তি রয়েছে। আপত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনোটিতে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত এবং আবার কোনোটিতে আংশিক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ইস্যুতে দলগুলোর আরও কাছাকাছি আসা উচিত। ঐকমত্য না হলে এগুলো বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।