Image description
টার্গেট সুষ্ঠু নির্বাচন

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তিনটি নির্বাচনে ভোটের অভিজ্ঞতা নেই জনগণের। রাতের ভোট, ডামি নির্বাচন, কারচুপি ও জননিরাপত্তাহীনতায় ভোটারদের মনে এখনো রয়েছে নানা শঙ্কা। তবে স্বচ্ছ, সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে অনেকটাই এগিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে নির্বাচন আয়োজনের চূড়ান্ত রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে কমিশন। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে অগ্রাধিকারে ভিত্তিতে অংশীজনদের সাথে সংলাপ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও তাদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে তরুণ ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ থাকবে। তাছাড়া নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা বুথ থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে কমিশন।

নির্বাচনে সম্ভাব্য ৪৫ হাজার ৯৮টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত করা। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামোগত সমস্যা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংকট প্রকট রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পন্ন করে এর আলোকে সৌরবিদ্যুৎ বা জেনারেটরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চিন্তা করছে ইসি। ভোট শুরু থেকে গণনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যাতে সিসিটিভি এক মুহূর্তের জন্যও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সে জন্য ইসি এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবে ইসি।

নির্বাচনে ভোটে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের ওপর কড়া নজরদারি বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। ভোটার ব্যালট বক্স ও ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যাধুনিক নিয়েও কাজ করছে কমিশন। শুধু এই প্রযুক্তিই নয়, বরং ভোট তদারকির জন্য আরো ছয় ধরনের স্পর্শকাতর পদ্ধতিকে আগামী নির্বাচনে কাজে লাগাতে তৎপর ইসি। এগুলোর মধ্যে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় গোপন ক্যামেরা (সিসিটিভি) স্থাপন এবং প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের অধীনে পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, সংবেদনশীল ভোটকেন্দ্রে আকাশপথে সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোনের ব্যবহার, ভোটকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের ভোটের গতিবিধি অতিগোপনে পর্যবেক্ষণ, তদারকি করা ও সরাসরি লাইভ টেলিকাস্ট করার জন্য তাদের (প্রিসাইডিং অফিসার) কাছে বডিক্যাম সরবরাহ (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ভোট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বডিক্যাম দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে)। নির্বাচনে উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন করে আরো ৪০ হাজার বডি-অর্ন ক্যামেরা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও লাইভ ভোট ডেটা পর্যবেক্ষণের জন্য ‘কপট’ অ্যাপের সহায়তা নিয়ে উন্নত প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটানো এবং প্রকৃত (রিয়েল টাইম) নির্বাচনী ফলাফল ও ভোটের অনিয়ম শনাক্ত করা, ভোটারদের দ্বারা ছবি-ভিডিওসহ ভোটের গোপন কক্ষের প্রকৃত চিত্র পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভোটের অনিয়মের প্রতিবেদন প্রদানে মোবাইল অ্যাপ চালু করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অনলাইন গুজব, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, ভুল তথ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার ঘটানো। এছাড়াও নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহনে বিশেষ করে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স পরিবহনকারী বাহনের অবস্থান শনাক্তে কাজে লাগানো হবে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ট্র্যাকিং পদ্ধতি। ব্যালটবক্স লুটপাট বা ডাকাতির মতো সন্ত্রাসীদের কবল থেকে নির্বাচনী মালামাল লুট ঠেকাতে মূলত কমিশন ওই ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার চিন্তা করছে। জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যালট পরিবহনের ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত কার্যকারিতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এ ইস্যুতে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে কমিশন কর্তৃক নির্বাচিত শহরাঞ্চলে পাইলট প্রকল্প অথবা বিকল্প হিসেবে চেক-ইন প্রটোকল ব্যবহার করে পথে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই প্রতিরোধ করার চিন্তা করছে কমিশন।

গত বছরের ৫ আগস্ট থানা ও স্টেশনগুলো ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল পুলিশ সদস্যরা। লুট হয়েছিল তাদের আগ্নেয়াস্ত্র। লুট হওয়া অস্ত্রের একটা অংশ উদ্ধার হলেও এখনো প্রায় দেড় হাজার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। যেগুলো অপরাধীদের কাছে চলে গেছে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী নির্বাচনের আগে এই অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই। যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭০০ অস্ত্র উদ্ধার বাকি রয়েছে। কিন্তু পুলিশের হিসাবে এক হাজার ৩৬৬টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরকার পতনের পর বিভিন্ন থানা ও পুলিশি স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৮১৮টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র এবং ছয় লাখ সাত হাজার ২৬২টি গোলাবারুদ লুট হওয়ার তথ্য এসেছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে বড় রকমের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে লুটের অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিকল্প নেই। লুট হওয়া অস্ত্র বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে চলে গেছে। এছাড়াও পতিত সরকারের নানা স্বীকৃত বাহিনী নির্বাচনকে ভন্ডুল করতে উৎ পেতে রয়েছে। ফলে নির্বাচনে নানা রকম চ্যালেঞ্জ থাকছেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে বিচক্ষণতার সাথে কাজ করতে হবে।

গত শুক্রবার নির্বাচনী কোর প্রশিক্ষকদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো আগে ছিল না। নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা বা অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত। আগেও আইন-শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ কমবেশি ছিল। তবে এখন হয়তো এর মাত্রাটা একটু বেশি।