
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে আনতে গত বছরই সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সব সরকারি কর্মচারীর হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে সবাই সম্পদের হিসাব জমা দিলেও এখন সেগুলো বিভিন্ন দপ্তর-মন্ত্রণালয়ে ‘আলমারিবন্দি’ হয়ে আছে। এই হিসাব কী করা হবে তার কোনো নির্দেশনা না থাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তর কিছু করতেও পারছে না। সবাই জনপ্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-দপ্তরে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রশাসন ক্যাডার, উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদ এবং অন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ। সেখানে ৬ হাজারের কিছু বেশি হিসাব জমা পড়েছে। অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের হিসাব সিলগালা খামে জমা দেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা সর্বশেষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৮ জন। এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা ১ লাখ ৯০ হাজার ৯২৮ জন। দশম থেকে ১২তম গ্রেডের কর্মকর্তা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭৭ জন। এ ছাড়া ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ৬ লাখ ২০ হাজার ৯৭২ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫৩৮ জন। অন্য কর্মচারী ৫ হাজার ৭০৩ জন। লাখ লাখ কর্মচারীর সম্পদের সিলগালা খাম নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করবেন নাকি আপৎকালীন সংরক্ষণ করবেন সে বিষয়েও কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় আরও বিড়ম্বনায় পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। হার্ডকপিতে সম্পদের হিসাব নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাটা বেশ ঝামেলাপূর্ণ, তাই এটি অনলাইন করা যায় কি না- সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার কথা বলেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী পাঁচ বছর পর পর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল এবং স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন এ নিয়ম মানেননি, এ বিষয়ে সরকারেরও কোনো তদারকি ছিল না।
গত বছরের আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে ১ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় সব সরকারি কর্মচারীকে সম্পদের হিসাব দিতে হবে। পরের দিন ২ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিস্তারিত জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান। সে সময় তিনি জানান, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিবকে সভাপতি করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিলের ফরম্যাট প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে বলা হয়েছিল। কমিটি ফরম্যাট ও সুপারিশ প্রতিবেদন দেওয়ার পর গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে জানান, সব সরকারি চাকরিজীবীকে প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দিতে হবে। ২০২৫ সাল থেকে প্রতি বছরের সম্পদের হিসাব ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দিতে হবে। তবে ২০২৪ সাল পুরো না পাওয়ায় ওই বছরের হিসাব ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়। পরে সময় এক মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয় এবং পরে আরও দেড় মাস অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়। যদিও সে সময় প্রশ্ন উঠে সরকারি চাকরিজীবীরা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার পরও আলাদাভাবে এই বাড়তি বিড়ম্বনা নিয়ে। এরপরও সরকারের নির্দেশনা মেনে সবাই সম্পদের হিসাব দিয়েছেন বলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। কিন্তু সম্পদের হিসাব পাওয়ার পর লাখ লাখ কর্মচারীর সিলগালা খামগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তরের আলমারিতে পড়ে আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিসভা বিভাগ, কৃষি অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন এ সম্পদের হিসাব কী করব তা নির্ভর করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ওপর। তা ছাড়া যেভাবে ফাইল সিলগালা রাখা আছে সেভাবেই রাখা ছাড়া আপাতত কাজ নেই। সম্পদের হিসাবের কোনো কাজ হয়েছে কি না জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রাহেদ হোসেন বলেন, হিসাব জমা নেওয়ার পর আর কাজ হয়নি। রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে একটা কাজ হবে। তবে বিষয়টি শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ দেখছে বলে জানান তিনি।
Advertisement
সম্পদের হিসাব কী হবে এ নিয়ে শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগে যোগাযোগ করলে যুগ্ম সচিব আলমগীর হোসেন বলেন, আমাদের প্রশাসন ক্যাডারে ৬ হাজারের ওপর কর্মকর্তার সবার তথ্য জমা হয়েছে। তাদের একটা ডেটাবেজ হচ্ছে, যার কাজ প্রায় সম্পন্ন। এটি সিলগালা অবস্থায় রাখা হবে। ভবিষ্যতে কারও নামে প্রশ্ন উঠলে মিলিয়ে দেখা হবে। তবে কর্মচারীদের বিষয়ে আমার সেকশনে কিছু জানি না।
অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব কি জমাই থাকবে, না কিছু হবে সে বিষয়ে জনপ্রশাসনের কেউ সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তবে জনপ্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা জানান, সিনিয়র সচিবের কাছে হয়তো এটি নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ভবিষ্যতে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তখন ট্যাক্স রিটার্ন ও সরকারের কাছে দেওয়া সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে। যেখানে গরমিল পাওয়া যাবে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সে কারণে জমা নেওয়া হয়েছে। এদিকে কৃষি, স্বরাষ্ট্র, খাদ্য, নৌ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, জনপ্রশাসন থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় সিলগালা করা কর্মচারীদের সম্পদের হিসাবগুলো কোথাও আলমারিতে রেখে দিচ্ছেন। কোনো দপ্তর, অধিদপ্তরে একইভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, এসব সিলগালা খাম যেখানে-সেখানে রাখা যাচ্ছে না। এর জন্য বাড়তি জায়গা লাগার কারণে বিড়ম্বনা বেড়েছে। নৌ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা কী করব এ সম্পদের হিসাব দিয়ে সেটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেবে জনপ্রশাসন। আগে জমা নিতে বলেছে, জমা নিয়ে রেখে দিয়েছি। কারওটা খুলতে বললে খুলে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু এনবিআরে সবাই ট্যাক্স দেয় তাই এটির দরকার ছিল না। এখন এসব ফাইল অনেকের কাছে বাড়তি ঝামেলা মনে হতে পারে। মাদার মিনিস্ট্রির নির্দেশনা পেলে পরে সে মোতাবেক ব্যবস্থা হবে।