
বংশাল থানা ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হোসেন গুমের এক যুগ হতে চলেছে। স্ত্রী ফারজানা আক্তারের গর্ভে রেখে যাওয়া ছেলে আরাফ হোসেন আজও বাবার মুখ দেখেনি। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা থেকেও হয়েছে বঞ্চিত। আড়াই বছর বয়সে বাবা হারা আদিবা ইসলাম হৃদি আজও ঘুমের ঘোরে বাবাকে ডাকে। আর দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্ত্রী।
সূত্রাপুর থানার ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড (বর্তমান ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড) ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল গুমেরও এক যুগ পার হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারায় মো. সাদমান শিহাব আরিয়ান। তার বয়স এখন ১৭। এখনো সে বাবার পথ চেয়ে বসে থাকে। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সোহেলের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মি সুলতানার মানবেতর দিন কাটছে।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি অপহৃত হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। স্বজনদের দাবি, রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এখনো তিনি ফিরে আসেননি।
শুধু পারভেজ, সোহেল ও কুদ্দুসুসই নয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে গুমের শিকার ৩৫২ জন এখনো ফেরেননি। নিখোঁজের এ পরিসংখ্যান গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’র। তারা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও জানেন না স্বজনরা। তারা আজও পথ চেয়ে বসে আছেন-হয়তো একদিন ফিরে আসবে প্রিয় মানুষটি। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধানে গঠন করেছে ‘গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি।’ কিন্তু তারা এখনো নিখোঁজদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমন বাস্তবতায় আজ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস।
প্রতিবছর দিবসটি উপলক্ষ্যে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। দিবসটি উপলক্ষ্যে ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মায়ের ডাকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ আমলে গুম ছিলেন ৭০৫ জন। ৫ আগস্টের পর অনেকেই আয়নাঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
গুম কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ১৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে কমিশনে। সেগুলো বিশ্লেষণের কাজ চলমান আছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ৩৩০ জন এখনো গুম রয়েছেন, যাদের ২১১ জনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গুমের শিকার। আর যারা ফিরেছেন তাদের ২৫৩ জনের বিষয়ে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে দিয়েছে কমিশন। সেখানে গুমের শিকার ওইসব ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের ধরন কেমন ছিল তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের স্ত্রী ফারজানা আক্তার যুগান্তরকে জানান, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তিন সহযোগীসহ তুলে নেওয়া হয় পারভেজকে। এরপর থেকে আর কোনো হদিস মেলেনি তার। সঙ্গে থাকা অপর তিনজন চাপা সোহেল, জহির ও চঞ্চলও এখনো নিখোঁজ। তিনি গুম কমিশনে অভিযোগ করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেছেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আশায় বুক বেঁধেছিলাম-স্বামী ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো এলো না। আমি আজও তার ফেরার অপেক্ষায় আছি, আমার বিশ্বাস সে ফিরে আসবে।
খালেদ হাসান সোহেলের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মি সুলতানা জানান, ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সোহেল এবং তার সঙ্গে থাকা সম্রাট, আনিস, বিপ্লব ও মিঠুকে তুলে নিয়ে যায়। ১১ দিন পরে আনিস, বিপ্লব ও মিঠুকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ফেরেনি সোহেল ও সম্রাট। তিনিও গুম কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন। মামলা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। শাম্মি ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, যারা ফিরে এসেছে তাদের কথাই কমিশন বেশি বলছে, রিপোর্ট তৈরি করছে। কিন্তু যারা এখনো ফেরেনি তাদের কথা কিছুই বলে না। তাদের ভাগ্যে কী জুটেছে তাও বলে না।
ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে ফারজানা আক্তার টুম্পা বলেন, আমরা গুমসংক্রান্ত কমিশনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি তাদের বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশেষ ট্রাইব্যুনালেও অভিযোগ করেছি। এখনো বাবার কোনো সন্ধান পাইনি।
গুমদের বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি গুম কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে এখনো আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পরে সংবাদ সম্মেলন করে সব বলব।
?মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে আমরা গুম থাকা ৭০৫ জনের তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। তাদের মধ্যে এখনো সাড়ে তিনশর বেশি ফেরত আসেনি। তারা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তা স্বজনরা এখনো জানেন না। তিনি বলেন, আমরা জানতে পেরেছি গুম কমিশনে ১৮৫০ জন গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক মানুষ গুমের শিকার হলেও ভয়ে সামনে আসতে চাচ্ছেন না।
সানজিদা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বছরের আগস্টে গুম কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশন যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে নিখোঁজদের আইডেন্টিফাই করার কোনো তথ্যই নেই। কিন্তু আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা ছিল কমিশনের মাধ্যমে নিখোঁজদের সন্ধান মিলবে। একটা ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়েছে। তাহলে কেন এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে আসেনি নিখোঁজ মানুষটার সঙ্গে কী করা হয়েছিল, কে করেছিল। তাহলে আমরা তো সেই ১২ বছর আগের জায়গাতেই রয়ে গেছি।