Image description

Mahbubur Razzaque (ডঃ মাহবুবুর রাজ্জাক)

অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

 
 
সারা দেশের ছাত্র প্রকৌশলীরা আজ বুধবার তিন দফা দাবীতে শাহবাগে জমায়েত হয়েছিল। তাদের দাবী গুলির মূল কথাটি হল সরকারি চাকুরীতে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। প্রকৌশলী পদ এবং পদবী হবে শুধুমাত্র স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাবীগুলির সাথে দ্বিমত করার কোন কারন নেই। দেশের প্রকৌশল খাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনের উচিৎ ছিল আন্দোলনকারীদের সাথে দ্রুত আলোচনায় বসা। অথচ পুলিশ তাদের উপর অকারণে বর্বর হামলা করে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরী করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরাও আন্দোলনে আছে। তারা নিজেদেরকে প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিতে চায় এবং প্রকৌশলীদের জন্য উপযুক্ত পদসমূহে বর্ধিত হারে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের পদায়ন চায়। এর বাইরে তাদের কিছু কিছু দাবী স্বার্থগত দ্বন্ধ থেকে উদ্ভূত; পেশাগত রেষারেষির কারনেই হয়ত তারা দাবীগুলি তুলেছেন। দাবীগুলি স্নাতক প্রকৌশলীদের এবং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গোটা প্রকৌশল খাতের স্বার্থবিরোধী।
দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নে প্রকৌশলী এবং প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের সমন্বিত টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের কাজ প্রকৌশলীদেরই করতে হবে। তেমনি প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদেরই করতে হবে। দুই দলের কাজই একটা আরেকটার পরিপূরক। কাজেই রেষারেষি নয়, প্রয়োজন কাজের সুষম বন্টন। উভয় পক্ষের উচিৎ আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যাসমূহের সমাধান করা এবং প্রকৌশল খাতের সম্বৃদ্ধির জন্য একসাথে কাজ করা।
আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৌশলী’ শব্দটি কোন বংশগত পদবী নয়। উন্নত বিশ্বে শুধুমাত্র একাডেমিক সনদের বলে প্রকৌশলী পদবী ব্যবহার করা যায় না। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর পেশাগত দক্ষতার একটি স্তর অতিক্রম করে প্রফেশনাল পরীক্ষা পাস করলেই কেবল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেয়া যায়। প্রকৌশলী পদবীটি তিনিই ব্যবহার করতে পারেন যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময় পরপর তাঁর লাইসেন্স নবায়ন করেছেন। তারা প্রকৌশল কাজে স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন, এবং নিরীক্ষণ করলে ধরে নেয়া যায় যে পেশাগত দায়িত্বশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করেই তা’ করেছেন। প্রকৌশলীদের জন্য একটি কোড অব ইথিক্স অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তারা তাদের কাজের জন্য আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন প্রকৌশলী তার লাইসেন্স হারান এবং প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকারও হারান।
প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা যায় এমন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেশে এখন বেড়েছে। তাই প্রকৌশল পেশায় মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারের উচিৎ প্রকৌশলী এবং প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীসহ প্রকৌশল খাতে সকল পেশাজীবিদের জন্য পেশাগত ট্রেনিং, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা। সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকুরীর জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যত বড় ডিগ্রিই থাকুক লাইসেন্সবিহীন কাউকেই প্রকৌশলী পদবী ব্যবহার করতে দেওয়া উচিৎ নয়। হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকলে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরা কেন, কার্যত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও প্রকৌশল পদবী ব্যবহার করতে পারেন না।
বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীদের এন্ট্রি পদ ৯ম গ্রেডের আর প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের এন্ট্রি পদ ১০ গ্রেডের। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ৯ম গ্রেডের ৩৩ শতাংশ পদ আবার ডিপ্লোমাধারীদের প্রমোশন দিয়ে পূরণ করার রীতি চালু করা হয়। কার্যত কোথাও কোথাও এর চেয়েও অনেক বেশি পদ ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথমত ৯ম গ্রেডে স্নাতক প্রকৌশলীদের ঢোকার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত ডিপ্লোমাধারীরা প্রমোশনের মাধ্যমে এমন সব পদে পদায়িত হচ্ছেন যেসব পদে স্নাতক প্রকৌশলীরাও বিসিএস ছাড়া যোগ দিতে পারে না। এটি স্নাতক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের বৈষম্য এবং প্রকৌশল খাতের জন্য অশনি সংকেত।
প্রশ্ন হল স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা পদায়িত হতে পারেন কিনা? উত্তর হল না। ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত নন। তাদের কর্মক্ষেত্র আলাদা। তাই উচিৎ হবে তাদের চাকুরি, পদায়ন ও প্রমোশনের জন্য অবিলম্বে প্রকৌশলীদের সমান্তরাল আরেকটি ধারা চালু করা। ফলে স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের পদ ও কাজ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হবে। প্রকৌশল খাতের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবি দলের মধ্যে অকারণ রেষারেষি বন্ধ হবে। দুই দল নিশঃঙ্কচিত্তে কাজে মনোযোগ দিলে কাজের গতি ও দক্ষতাও বাড়বে।
প্রকৌশল সংস্থাগুলিতে ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তাবৃন্দ সংস্থা প্রধান হয়ে থাকেন। তারা প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না। সম্প্রতি একজন মাননীয় উপদেষ্টা দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। অথচ এই প্রকৌশলীরাই বিদেশের মাটিতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। সমস্যা প্রকৌশল শিক্ষায় নয়, সমস্যা প্রকৌশল সংস্থাগুলির ব্যবস্থাপনায়। প্রকৌশল সংস্থা গুলিতে কাজের গতিশীলতা আনতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরী হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের দ্বন্ধে মেধার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে প্রতিটি পেশাতেই মেধার প্রয়োজন; এমন কি যিনি ফসল ফলান তাঁরও। মেধার প্রমাণ দেখিয়েই স্নাতক এবং ডিপ্লোমা সনদসমূহ অর্জন করতে হয়। তবে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে। কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগারের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব, সঠিক মূল্যায়নের অভাব, ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহ বেশি অবহেলার স্বীকার। এই দায় ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ডিপ্লোমাধারীরা যেন তাদের কাজে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন সেইভাবে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।
বলা হয়, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই অনুচিত। উচ্চ মাধ্যমিক বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা সনদের জন্য চার চারটি বছর ব্যয় করাটা কতটা যৌক্তিক তাও ভেবে দেখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে কারিগরি বোর্ডের আওতায় উচ্চ মাধ্যমিক সনদ দিয়ে যারা উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী তাদের যদি সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। যারা তারপর পলিটেকনিকে কারগরি ধারায় থাকবে তারা দুই বা তিন বছরে প্রকৌশলে ডিপ্লোমা নিয়ে হয় শ্রমবাজারে যাবে, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুই বছরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবে।
তবে ভুলে গেলে চলবে না, সবাই প্রকৌশলী হতে চাইলে সেটাও প্রকৌশল খাতের সুষ্ঠ বিকাশের জন্য সহায়ক নয়। তাই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য প্রস্তাবিত ক্যাডারে সন্মানজনকভাবে পেশাগত বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে যাতে তারাও সন্তুষ্ট চিত্তে পেশায় মনযোগী হতে দ্বিধান্বিত না হন। পরিশেষে, প্রকৌশলখাতে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহন বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন তারা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন এবং সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শণ করতে পারেন।