
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালের মে মাসে ঢাকা জেলা পরিষদের মালিকানাধীন কাঁটাবনের ২০ শতাংশ জায়গা দখল করেন তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপস। পরে শুরু করেন একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই স্থাপনা সরিয়ে নিতে তিন দফায় চিঠি দিলেও সাড়া দিচ্ছে না ডিএসসিসি।
জেলা পরিষদের নথিতে দেখা যাচ্ছে, ওই জায়গায় ভবনের বেজমেন্টসহ অন্যান্য স্থাপনা সরিয়ে নিতে পরিষদ ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর প্রথম চিঠি দেয় এ বছরের জানুয়ারির ২৯ তারিখে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে দেওয়া হয় আরেকটি চিঠি। তৃতীয়বারের মতো চিঠি দেওয়া হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। চিঠিতে সাড়া না পেয়ে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেও কোনো সদুত্তর পাচ্ছে না সংস্থাটি।
মে মাসের ৮ তারিখ (২০২৩ সাল) হঠাৎ সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে আমাদের লোকজন তাড়িয়ে দিয়ে জায়গাটি দখল করে নেন। আমি থানায় যাই মামলা করতে। পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা করি। স্থানীয় মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে। তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
২০২৩ সালের মে মাসে জায়গাটি যখন দখল করার ঘটনা ঘটে, তখন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন মেহেদি হাসান। তিনি এখন মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাঁটাবনের জায়গাটিতে আমরা একটি কনভেনশন সেন্টার করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সব অনুমোদন শেষ করে টেন্ডারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে মে মাসের ৮ তারিখ হঠাৎ সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে আমাদের লোকজন তাড়িয়ে দিয়ে জায়গাটি দখল করে নেন।’
মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমি থানায় যাই মামলা করতে। পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা করি। স্থানীয় মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে। তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

জেলা পরিষদের নথিতে দেখা গেছে, কাঁটাবনে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে বহুতল ভবন বানাতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শেলটেক কনসালট্যান্ট প্রাইভেট লিমিটেডকে নিয়োগ দেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেখানে বেজমেন্টের কাজ সম্পন্ন করার পর কাজ আর এগোয়নি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি দেড় মাস হলো। এ বিষয়ে জানতে হলে আপনি প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলে প্রথম আলোকে জানান। তিনি ডিএসসিসির জরিপকারক মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জায়গাটি ঢাকা জেলা পরিষদের। এলাকার উন্নয়নে এখানে তৎকালীন মেয়র তাপস একটি কমিউনিটি সেন্টার করতে চেয়েছিলেন। সে জন্য বেজমেন্টের কাজও সম্পন্ন করা হয়। ৫ আগস্টের পর জেলা পরিষদ কাজ বন্ধ রাখতে বললে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এ রকম বলপ্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ইচ্ছামাফিক কর্তৃত্ববাদের চর্চাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ চর্চাটা এখনো অব্যাহত আছে। সিটি করপোরেশন জেলা পরিষদের ন্যায্য জায়গা ফেরত দেবে না, চিঠির সাড়াও দিচ্ছে না, সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাহলে ধরে নিতে হবে কিছু ব্যক্তির পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদের যে চর্চা, তাতে পরিবর্তন আসেনি, যা অগ্রহণযোগ্য।
এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের একটি মার্কেট গুঁড়িয়ে দেন। সেখানে ৭২টি দোকান ছিল। এ ঘটনায় রাজস্ববঞ্চিত হওয়ায় ক্ষতিপূরণ দাবি করে সম্প্রতি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাতেও কোনো সাড়া পায়নি সংস্থাটি।
ডিএসসিসির জেলা প্রশাসক এ বিষয়েও কিছু অবগত নন বলে প্রথম আলোকে জানান।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে কাঁটাবন এলাকার ২০ শতক জমির অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে একাধিকবার পত্র দেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে সাড়া দেয়নি।
‘পরে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি, যা হতাশাজনক। এ ছাড়া নন্দীপাড়া মার্কেট গুঁড়িয়ে দিয়ে এতজন বৈধ ব্যবসায়ী দোকানমালিকের অপূরণীয় ক্ষতি করা, জেলা পরিষদের নির্মিত মার্কেট মুহূর্তে বিলীন করে ফেলার বিষয়ে আমরা ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই’, বলেন মোয়াজ্জেম হোসাইন।
উত্তরেও স্থাপনা দখলমুক্ত করার চিঠিতে সাড়া নেই

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মোহাম্মদপুরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান ওরফে রাজীব ২০১৫ সালে কাউন্সিলর হওয়ার পর জেলা পরিষদের মালিকানাধীন মোহাম্মদপুরের একটি পাঁচতলা কনভেনশন সেন্টার দখলে নেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দখলে রয়েছে সেটি।
এ বিষয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এ ভবন অবৈধ দখলমুক্ত করে আমাদের ঠিকাদারদের কাজ করার সুযোগ দিতে কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। তারা কোনো সাড়া দেয়নি। গত ১ অক্টোবর ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মৌখিকভাবে কিছুদিন সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ মাসেও তাঁরা কথা রাখেননি।’
জানতে চাইলে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ পাওয়া উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে জেলা পরিষদের কথা হয়েছে। আমরা ঈদের পরপরই ভবনটি তাদের বুঝিয়ে দেব।’
দখলের চিত্র সরেজমিনে
গত ২২ মার্চ দুপুরে কাঁটাবনে গিয়ে দেখা যায়, জেলা পরিষদের জায়গাটি দখল করে দক্ষিণ সিটির দেওয়া টিনের বেষ্টনি রয়ে গেছে। গেট তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি এ প্রতিবেদক। সেখানে কথা হয় জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার লোকমান হোসেনের সঙ্গে।
লোকমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জায়গাটির দাম বর্তমান বাজারমূল্যে শত কোটি টাকা। অন্যায়ভাবে সিটি করপোরেশন জেলা পরিষদের জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। বেজমেন্টসহ তাদের নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিতে বলা হলেও করপোরেশন কর্ণপাত করছে না।
খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে ভেঙে দেওয়া মার্কেটের পিলার এখনো দৃশ্যমান। এখানে কথা হয় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানমালিকদের কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের একজন মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমাদের ওপর ভয়াবহ জুলুম করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে এসে পুরো মার্কেট গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা এখনো দোকানের বিদ্যুৎ বিল দিয়ে যাচ্ছি।’
আবার মোহাম্মদপুরে চাঁদ মিয়া হাউজিং সোসাইটির ২ নম্বর সড়কে জেলা পরিষদের পাঁচতলা কনভেনশন সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় ভবনটির কাঠামোর নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এখনো টাইলস, গ্লাস ও রঙের কাজ হয়নি। ভবনের নিচতলার ডান পাশে কাডবোড দিয়ে তৈরি একটা ছোট কক্ষে কয়েকটি চেয়ার ও টেবিল। বাঁ পাশের একটা কক্ষে উত্তর সিটির মশকনিধন কার্যক্রমের সরঞ্জাম। দ্বিতীয় তলায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সচিবের কক্ষ।
ভবনের নিচতলায় সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আমীর হোসেনের সঙ্গে দেখা। ভবনের মালিকানা কার, জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি জেলা পরিষদের। আমরা আসছি আমাদের (সিটি করপোরেশনের) জিনিসপত্র সরাতে। আমরা অনেক দিন ধরে এখান থেকে মশকনিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’
‘ওপরের স্যাররা বলেছেন জিনিসপত্র সরাতে। তাই আমরা আসছি এসব সরিয়ে নিতে। এ পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০ ড্রাম মশার তরল ওষুধ সরিয়েছি’, বলেন আমীর।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা সরকারি সংস্থা অন্য আরেকটা সরকারি সংস্থার জায়গা দখল করতে পারে না। এটা অবৈধ। কর্তৃত্ববাদের সময়কালে সবই সম্ভব ছিল।’
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘এ রকম বলপ্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ইচ্ছামাফিক কর্তৃত্ববাদের চর্চাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ চর্চাটা এখনো অব্যাহত আছে। সিটি করপোরেশন জেলা পরিষদের ন্যায্য জায়গা ফেরত দেবে না, চিঠির সাড়াও দিচ্ছে না—সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাহলে ধরে নিতে হবে কিছু ব্যক্তির পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদের যে চর্চা, তাতে পরিবর্তন আসেনি, যা অগ্রহণযোগ্য।’