
Maskwaith Ahsan(মাস্কওয়াইথ আহসান)
১৯৭১ সাল পর্যন্ত যারা খড় বা টিনের চালা ও পাটখড়ি বা চাটাইয়ের বেড়ার ঘরে থাকতো; ১৯৭২ সালে তারা কি করে বাবর রোড, ধানমন্ডি, বেইলি রোড, গুলশানের অভিজাত এলাকায় উঠে এলো; সে প্রশ্ন কেউ কখনো করেনি। দাদা পাকিস্তান আমলে দশ রুপি নিয়ে ঢাকায় এসেছিলো; সেই দাদা কি এমন আলাদীনের চেরাগ পেলো যে নাতি-নাতনি এখন ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় ইংরেজি বলে; বাবা স্বাধীন বাংলাদেশে ৩৫ টাকা নিয়ে ঢাকায় এলো; ছেলে মেয়ে কি করে পশ্চিমের সেকেন্ড হোম থেকে ভুস করে স্পোর্টস কার নিয়ে বের হচ্ছে সে প্রশ্নের উত্তর নেই। সীমিত সরকারি চাকরির বেতনে কি করে সুরম্য অট্টালিকা তুললো সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা; এসব প্রশ্নের সুরাহা কখনো হয়নি। শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিশাল গাড়ি বহর নিয়ে সবাই স্পিকটি নট। খালেদা জিয়ার আশীর্বাদ নিয়ে কি করে হেলিকপ্টারে চড়লো লালু ও কালু; হাসিনার দোয়া নিয়ে বাচ্চু-কাচ্চু কি করে প্রাইভেট জেট-এ চড়লো; তা নিয়ে কথা বলার সময় কোথায়।
ভাই ভাই করেই কূল পায়না তার আবার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতার সামনে "প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি"ই নেমেসিস।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘনত্বের শহরে বেড়ে ওঠা তার ১৭০০ থেকে ৩০০০ স্কয়ার ফিট জগতে বসে কার্যত উল্লেখযোগ্য কোন কাজ না করে; রাষ্ট্রীয় স্টেটাসকোকে মেনে নিয়ে হাসিনার পতনে খালেদার বন্দরের আশেপাশে ডিঙ্গি নৌকা হয়ে ঘুরছে। কিন্তু তাদের জাত ক্রোধ জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া তরুণ-তরুণীদের প্রতি। যারা প্রৌঢ় তারা ২০২৪-এর তরুণের হাতে অবাক সূর্যোদয় দেখে বিস্মিত হয়েছে। এরপর ফেসবুকে কামড় দিয়ে ধরেছে তাদের। আর প্রৌঢ়ারা অনেকে তো এসে বিপ্লবী তরুণীদের নিয়ে এতো অমার্জিত কথা বলেছে যে স্পষ্ট হয়ে গেছে তাদের থকথকে মনোজগত।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের টাকার খেলার জগতে বিপ্লবী তারুণ্যের জাতীয় নাগরিক পার্টির কাছে এই স্মার্ট বাংলাদেশের চাওয়া; তারা যেন ভাসানীর মতো লুঙ্গি গান্ধীজীর মতো ধুতি পরে নেমে যায়। এ আর কিছুই নয়; বিংশ শতকের কথিত রুলিং এলিট ছলেবলেকৌশলে পেছন থেকে কামড় দিয়ে ধরে রাখতে চাইছে এনসিপি'র তরুণ-তরুণীদের। ভাটিয়ালি অপরিপক্কতায় ৫৩ বছরে বৈষম্য ধূসর রাষ্ট্র লালন করে এখন বড় মুখ করে এনসিপির ছেলেদের অপরিপক্ক বলে জ্ঞান প্রক্ষালন করতে এসেছে। সুযোগ পেলেই দলীয় অধ্যাপক আর টকশোর পকপকেরা শিক্ষা দেয় এদের। এইসব সমুদ্র সমান জ্ঞান নিয়ে এরা পড়ে ছিলো হাসিনা ও তার দোসরদের লেজের নীচে। এখন খুঁজছে বিএনপির লেজ। সেখানে এনসিপি যেন দুধভাতে উতপাত।
পৃথিবীর সবচেয়ে গ্রাম ভিত্তিক শহর; যা মেট্রোপলিটন বা কসমোপলিটান মন তৈরি করতে পারেনি; সেইখানে বসে ঢাকায় ১০ রুপি নিয়ে আসা শুক্কুর আলীর নাতি-নাতনি; ৩৫ টাকা নিয়ে আসা আবুল খায়েরের ছেলে-মেয়ে বড্ড এফলুয়েন্ট ও ইন সেজে; বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকায়; তাদের মাপামাপি করে। কলতলা বা পুকুর ঘাটে বসে মাপামাপি করা প্রোটোজায়া এখন ফেসবুকে নিজের দুই ইঞ্চি চিন্তার গজফিতা দিয়ে মাপামাপি করে জুলাই বিপ্লবীদের।
এক ছেলেকে দেখলাম সার্জিসকে কৃষক সাজিয়ে ছবি এঁকেছে। ভাবলাম, দেখিতো কোন বৃটিশ কুইনের নাতি এসেছে সে। দেখলাম আর্যকল্পনার এক বেগুনি আইডেন্টিটি। পৃথিবীর সব দেশে প্রতিষ্ঠিত মানুষেরা কৃষক আত্মপরিচয়কে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে। আর আমাদের সমাজে বৃটিশ কোলাবরেটর মিডলম্যানরা হঠাত জমিদার হয়ে কৃষককে তুচ্ছ করার সংস্কৃতি চালু করে গেছে।
জুলাই বিপ্লবে যে ছেলে-মেয়েরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে; তারা নিজ এলাকায় গেলে এলাকাবাসী নিজে থেকেই তাকে সম্বর্ধনা দেয়; সবাই মিলে একটা বড় আয়োজন করে। বাংলাদেশের মানুষ এলাকার ভালো ছাত্র-ভালো খেলোয়াড় বা সুকৃতিসম্পন্ন যে কাউকে এলাকার সুনাম বৃদ্ধির জন্য পুরস্কৃত করে। এটাই আবহমান বাংলাদেশের সংস্কৃতি।
ফেসবুকে শুক্কুর ও খায়ের ডাইন্যাস্টির লোকজন খুঁজে খুঁজে ক্ষমতাসীন নেতা ও বিসিএস কর্মকর্তার পোস্টে গিয়ে তেলাঞ্জলি দিতো। আর প্রথম আলো কাউকে "সফল যারা কেমন তারা" বললে তাকে গিয়ে একটু বাহবা দিয়ে আসতো। কিন্তু জুলাই বিপ্লবীদের সঙ্গে কি এক মানসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা; এই মনস্তত্ব অকল্পনীয়।
এরা আসলে রাজতন্ত্র প্রিয়। রহমান এন্ড রহমান ডাইন্যাস্টির বাড়ির সামনে জুতা খুলে মাথায় নিয়ে যাবে; আর প্রজাতন্ত্রের প্রজার ছেলে নেতৃত্ব দিলে তাকে পেছন থেকে কামড়ে ধরা রাশির লোক। একেবারে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে ফেলে ছিদ্রান্বেষণ চলতে থাকে ছেলেগুলোর। এতোই যখন জবাবদিহিতা প্রিয়; চলুন নিজের বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করি, আপনার বেসিক বেতন যা ছিলো; তা দিয়ে এতো বড় বাড়ি বানালেন কি করে; বিদেশে আমাদের পড়তে পাঠানোর টাকা কোত্থেকে এলো। এই যে সেনাকুঞ্জে সিনথিয়াপ্পির বিবাহ অনুষ্ঠান করলেন, এতো টাকা এলো কোত্থেকে! বিংশ শতক জুড়ে আর একবিংশের প্রথম ২৪ টি বছর দেশ লুন্ঠন করে একে যারা ঝাঁঝরা করে দিয়েছে; তাদের অবৈধ সম্পদের হিসাব আগে হালনাগাদ করুন। বিপ্লবী তরুণদের নেতা নাহিদ যেমন আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে; অন্যেরাও দিয়ে দেবে; ও নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করে রাতের ঘুম নষ্ট করার দরকার নাই। কোনটা জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করতে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন আর কোনটা কামড়ে ধরা; সে ইনটেনশন স্পষ্ট বোঝা যায় শব্দ-বাক্য ও দেহভঙ্গিতে।
বিএনপি-জামায়াত-বাম দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিন। এগুলো পুরোনো রাজনৈতিক দল। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি গণ আকাংক্ষার দল। বাংলাদেশের যে মানুষগুলোর জীবন জীবিকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করেনি; যারা ফ্যাসিজমের বেনিফিশিয়ারি নয়; যারা চিন্তার জগতে অগ্রসর; তারা পরিবারতন্ত্রের বাইরে একটি প্রজাতান্ত্রিক দল চেয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ পালা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভয়ে ভয়ে বেঁচেছে। ফলে এনসিপিকে সমর্থনও তাদের করতে হয় লুকিয়ে চুরিয়ে। এনসিপিকে আজ প্রকাশ্যে চাঁদা দিলে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এসে লালু-কালু-বাচ্চু-কাচ্চু যে এক কোপে ধড় নামিয়ে দেবে না; সে গ্যারান্টি কোথায়! তাই দেখবেন দু'হাজার চব্বিশের মায়েরা গোপনে হাতের বালা খুলে দিয়ে যাবে এনসিপিকে; যেভাবে তারা বিপ্লবকালে পানি কিংবা বিস্কিট এনে খাইয়েছিলো। তৃতীয় এই রাজনৈতিক দল বিকশিত হতে দিন। আপনার পরের প্রজন্মের নিশ্চয়ই কসমোপলিটন আধুনিক মন হবে। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার একটা প্লাটফর্ম তো লাগবে। হয়তো শুক্কুর আলী ও আবুল খায়েরও এরকম প্লাটফর্ম খুঁজেছিলো; না পেয়ে রহমান এন্ড রহমান মাজারে গিয়ে সেজদা দিয়েছে।
(বিষণ্ণতার শহর টু পয়েন্ট ও)
ছবিতে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নেতারা