দেশের জনসংখ্যা কত? কত মানুষ বেকার? কী পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়? সাক্ষরতার হারই বা কত? রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মিলছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। এক সংস্থার তথ্যের সঙ্গে অন্য সংস্থার তথ্যের গরমিল তো রয়েছেই, একই প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে একই বছরের পরিসংখ্যানেও রয়েছে গরমিল। পরিসংখ্যানের এই গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা। সব ক্ষেত্রে ভুল উপাত্তের কারণে গ্রহণ করা যাচ্ছে না সঠিক জাতীয় পরিকল্পনা। আমদানি নীতিতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জনসংখ্যা, খাদ্য উৎপাদন, সাক্ষরতা, কৃষিভূমির ব্যবহারসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভেদে রয়েছে উপাত্তের গরমিল। পরিসংখ্যান সঠিক হলে আগামী চার বছর ধানের আবাদ বন্ধ রেখেও চার বছর পুরো জাতিকে খাওয়ানো যেত। অথচ প্রতি বছর চাল আমদানি করতে হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের সব মৌলিক তথ্যের পরিসংখ্যানে ঘাটতি আছে। এটি শুধু সংখ্যার বিভ্রান্তি নয়। কারণ রাষ্ট্রের বাজেট, খাদ্য মজুত, আমদানি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার পরিকল্পনা নির্ভর করে এসব উপাত্তের ওপর। ভিত্তির সংখ্যা ভুল হলে- সেই তথ্যের ওপর দাঁড়ানো পরিকল্পনাও ভুল হয়। এর মূল্য শেষ পর্যন্ত গুনতে হয় রাষ্ট্রকে-কখনো অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে, কখনো খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে, আবার কখনো প্রকৃত বেকার ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনার বাইরে রেখে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপাত্তে ভুল হলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ফলাফল মূল্যায়ন ভুল হবে। সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে না। বিগত সরকারের সময়ে যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে বড় সমস্যা হিসেবে উপাত্ত সংকটের কথা বলা হয়েছিল। কারণ উন্নয়নের মৌলিক চাহিদা হলো সঠিক উপাত্ত। শুধু এই উপাত্তের বিভ্রান্তিই দূর করা নয়, নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। আমরা এখনো চার বছর আগের হাউজহোল্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের প্রতিবেদন ব্যবহার করছি। অথচ, এই সময়ে পরিসংখ্যান কত বদলে গেছে।’
চালের হিসাবে যত গরমিল : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৫ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চাল উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৭ টন। পরের অর্থবছরে তা কমে দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৯৭ লাখ ৯১ হাজার ৯৮১ টন। আবার ২০২৪-২৫ সালে উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ ২৯ হাজার ৮৮৪ টন।
অন্যদিকে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে চাল উৎপাদন ৪ কোটি ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ৪ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ১০০ টন। একই বছরের হিসাব নিয়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবধান লাখ লাখ টনের।
গরমিল রয়েছে একই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেও। ডিএইর ২০২২-২৩ সালের প্রতিবেদনে ২০২১-২২ অর্থবছরে চাল উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৪০০ টন। কিন্তু পরের বছরের প্রতিবেদনে একই অর্থবছরের উৎপাদন নেমে এসেছে ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪৫ হাজার ৩০০ টনে। ব্যবধান প্রায় ২২ লাখ ৬৩ হাজার টন। এদিকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করে আসছে। প্রথম তিন বছর বাদ দিয়ে পরের ১৩ বছরে প্রায় ৪৭ কোটি ৬৫ লাখ টন চাল উৎপাদনের হিসাব পাওয়া যায়। বিবিএসের দৈনিক মাথাপিছু চাল ভোগের হিসাবে ১৩ বছরে মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে লেগেছে সর্বোচ্চ ২৭ কোটি ৩ লাখ ৩ হাজার ৯১১ মেট্রিক টন। গবাদি পশুর খাবার, অপচয়, বীজ ও অন্যান্য কাজে লেগেছে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন। উদ্বৃত্ত থাকার কথা ৮ কোটি ২৩ লাখ ১৩ হাজার ৯৩৩ টন চাল, যা দিয়ে ধানের আবাদ বন্ধ রেখেও দেশের মানুষকে প্রায় ৪ বছর খাওয়ানো সম্ভব। অথচ, এ সময়ে প্রায় সোয়া কোটি টন চাল আমদানি করতে হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু সরকারই আমদানি করেছে ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টন চাল।
জমির হিসাবেও প্রশ্ন : বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশের উৎস। বিবিএসের হিসাবে ২০২০-২১ সালে বোরো আবাদের জমি ছিল ৪৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬২১ হেক্টর। কিন্তু একই সময়ে স্যাটেলাইট ইমেজ ও মাঠপর্যায়ের নমুনা বিশ্লেষণ করে পরিচালিত একটি গবেষণায় চারটি অ্যালগরিদমে বোরো জমির পরিমাণ পাওয়া গেছে ২৪ লাখ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪২ লাখ হেক্টর। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আবাদি জমির পরিমাণেই যদি গলদ থাকে, উৎপাদনের তথ্য কতটা সঠিক?
জনসংখ্যারও ভিন্ন ভিন্ন হিসাব : ২০২৫ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় নির্বাচন কমিশন দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি বলে জানায়। একই সময়ে বিবিএসের বিভিন্ন হিসাবে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩৬ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৬৫ লাখের মধ্যে। ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের হিসাবে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে রাজধানী ঢাকাতেই জনসংখ্যা ১ কোটি ৫১ লাখ, যেখানে বিবিএসের তথ্যানুসারে সংখ্যাটা ১ কোটির কিছু বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যায় ভুল হলে স্কুল, হাসপাতাল, আবাসন, খাদ্য, পানি ও কর্মসংস্থানের চাহিদার হিসাবও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বেকারত্ব ও যুবর সংখ্যায় বিভ্রান্তি : জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের যুব হিসেবে ধরা হলেও বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের যুব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে যুব কর্মসংস্থান নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনার লক্ষ্য জনগোষ্ঠী ভিন্ন। এতে যুব উন্নয়ন পরিকল্পনা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেকারত্বের ক্ষেত্রেও সরকারি হিসাব পুরো বাস্তবতা তুলে ধরতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করলেই তাকে আর বেকার ধরা হয় না। ফলে ছদ্ম বেকারত্বে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা এবং সেখানে পড়া শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই। প্রাথমিক পর্যায়ের ঝরে পড়া, সাক্ষরতার হার ও নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন জরিপে অমিল রয়েছে।
পথশিশু, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরও নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার না করা, মাঠপর্যায়ে অনুমাননির্ভর হিসাব, পুরোনো উপাত্ত ব্যবহার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাপ্তরিক সাফল্য দেখানোর প্রবণতা পরিসংখ্যানগত এ বিভ্রান্তির কারণ।