‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে। যারা জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকারকে উপেক্ষা করবেন, ইতিহাস তাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। সরকার মূলত আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ফিরে যাওয়ার সব আয়োজন পূর্ণ করে ফেলেছে।
শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সংসদের প্রথম অধিবেশনের রেওয়াজ অনুযায়ী তা উত্থাপিত হলেও সব বিষয়ে আলোচনা হয়নি; বরং এমন ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যা বলবৎ থাকলে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যেত।
প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নিরপেক্ষ ও যোগ্যদের বদলে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। এ ছাড়া মেধার ভিত্তিতে চাকরির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মান না জানিয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের চাপের মুখে বিদায় করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে দলীয় কর্মীদের মূল্যায়নের যে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের যুবসমাজের প্রতি অবিচার।
বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ না করলে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলেই জামায়াত সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা দিলে দলমত-নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
জামায়াত নেতা বলেন, গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেখানে সংস্কার না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
র্যাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করে পুরোনো জনবল বহাল রাখলে সমাধান হবে না। বর্তমান সদস্যদের নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দিয়ে যোগ্য ও দেশপ্রেমিকদের নিয়ে নতুন কাঠামো গঠন করতে হবে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপট টেনে শফিকুর রহমান বলেন, ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন সরকার প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করে। জনগণের ওপর আস্থা হারিয়ে তারা রক্ষীবাহিনী গঠন করে, যাদের হাতে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাসহ ৩৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য ছিল আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে চারটি পত্রিকা ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদ করায় তৎকালীন একজন সংসদ সদস্যকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বহুদলীয় গণতন্ত্রকে বিলুপ্ত করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়; যার প্রতিবাদে জেনারেল আতাউল গনী ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সংসদ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।
৭ নভেম্বরের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ওপর অবজ্ঞা এবং একের পর এক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান বন্দি হন। এরপর ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংঘটিত হয়ে তাঁকে মুক্ত করেন এবং সাধারণ মানুষ তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সিপাহিদের বিপ্লব ও জনতার সংহতির কারণেই দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’।
তিনি বলেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৫ সালে বিএনপি দল হিসেবে ছিল না। তাই ইতিহাসের কোনো ব্যক্তির অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারীসহ মুক্তিযুদ্ধের সব পর্যায়ের অবদানকারীদের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি হতে পারে না।