দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একের পর এক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। আজও কয়েক শ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। আজ মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কাজে যোগ না দেওয়া এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে গতকাল সোমবার অন্তত ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি।
আজ শ্রমিক বিক্ষোভের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে। পোশাকশ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় সড়কে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। কোনাবাড়ী, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার ৫০টি তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এর আগে সোমবারও একই এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়ার প্রায় ৪০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। আরও প্রায় ১০টি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন।
শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর মিরপুর শিল্পাঞ্চলেও। সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে পল্লবী-মিরপুর-১০ সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় অন্তত চারজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনেও সাময়িকভাবে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়।
শ্রমিক আন্দোলন, কাজে যোগ না দেওয়া এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে গতকাল সোমবার অন্তত ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৩৮২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সাভার-আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ২২৩টি এবং মিরপুরে ৬৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
এর আগের দিন ১ নভেম্বর বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে ৩১৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। এতে কর্মস্থলে যেতে না পারা বা কাজ বন্ধ রাখা শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ২ হাজার ২৫৫ জন।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু কারখানার মালিক বা শ্রমিক নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। আজও কয়েক শ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। আজ মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে রপ্তানি চালান বিলম্বিত হওয়া, ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়া, নতুন অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবহন, প্যাকেজিং, বস্ত্র, সুতা, আনুষঙ্গিক পণ্য ও অন্যান্য সহযোগী খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিজিএমইএও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি চালান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।