Image description
Qadaruddin Shishir(কদরুদ্দীন শিশির)
সবাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছেলেমেয়েদের নতুন পার্টির কাছ থেকে অনেক বড় বড় আশা করছেন। 'তারা বিএনপি-আওয়ামীলীগ-জামাত' এদের বাইরে গিয়ে আরও ভাল কিছু করবেন দেশের জন্য', 'তারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে হাজির হবেন'--- এরকম আরও নানান আশা প্রত্যাশা।
আমিও যে তাদের নিয়ে আশার জাল বুনছি না তা নয়। ওরা তো অলরেডি আমাদেরকে তাদের ওপর আশা ও ভরসা করার মতো অনেক কিছুই দিয়েছে।
 
কিন্তু আমি যা নিয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো, এই ছেলেমেয়েদের প্রায় সবাই শহর ও গ্রামের মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা। এবং এদের বেশিরভাগই তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেনি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এদের উপর এদের বাবা মায়ের অনেক প্রত্যাশা আর্থিক দিক থেকে। পরিবার চালানোর দায়িত্ব নিতে হবে। অনেককে নিজে আয় করে বিয়ে শাদি করতে হবে, এবং বউ বাচ্চাকে নিজের আয় দিয়ে চালাতে হবে। এরা আন্দোলন শুরুই করেছিল চাকরির জন্যে।
 
এমন অবস্থায় এদের অনেককেই পুরোদমে রাজনীতিতে যুক্ত হতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে যারা রাজনীতি করবেন তারা আসলে অন্য চাকরিবাকরির সুযোগ পাবেন না। ফুল টাইমই রাজনীতিতে দিতে হবে। বিশেষ করে এক বছরের মধ্যে যখন নির্বাচন আসছে তখন তাদেরকে নতুন দলের হয়ে দিনে রাতে কাজ করে যেতে হবে এবং এর মাধ্যমে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে হবে।
 
কিন্তু এই সময়ে তাদের পেটও চালাতে হবে। অনেককে পরিবারও চালাতে হবে। এবং রাজনীতি করতেও অনেক খরচ আছে। প্রতিদিন মানুষের সাথে সাক্ষাত করতে যেতে বা মানুষ সাক্ষাত করতে এলেও পকেট থেকে চা/নাস্তা/যাতায়াতের টাকা খরচ করতে হবে। মাসে বেশ অনেক টাকা প্রয়োজন প্রতিটা তরুণ রাজনীতিকের।
 
কয়জনের পরিবার এই টাকা দিতে পারবে?
 
তাহলে নিজেদের চলার এবং রাজনীতিতে খরচ করার এই টাকা কোথা থেকে আসবে?
 
হতে পারে নতুন গঠিত দল তাদের নেতানেত্রীদের যারা ফুল টাইম রাজনীতি করবেন তাদের জন্য মাসিক একটা আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করবে। তখন প্রশ্ন আসবে, নতুন এই দল কোথা থেকে টাকা পাবে? দলের সদস্যরা চাঁদা দেবেন? সেই চাঁদাই কি এনাফ দেশব্যাপী একটা দল চালাতে? বিশেষ করে একটা জাতীয় নির্বাচন করতে?
 
অবশ্যই যে কোনো দলের ফান্ডে যে কোন ধনবান ব্যক্তিও দান করতে পারেন। সেভাবে অনেক ধনবানের অনুদান থেকে দলীয় ফান্ড গঠিত হতে পারে।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসবে স্বচ্ছতার। কে টাকা দিচ্ছে, কত দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, কিভাবে দিচ্ছে? এগুলো কি আমরা জানতে পারবো নতুন দলের কাছ থেকে? যদি না জানতে পারি তাহলে আমরা কিভাবে বুঝবো নতুন দল কার বা কাদের অনুদান নিয়ে কাদের প্রতি দুর্বলতা তৈরি করছে এবং পরে কখনো এই দল ক্ষমতাবান হলে কাদের কিভাবে সুবিধা দেয়া হবে?
 
নতুন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে তো আমরা বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো গোপনীয় আদান প্রদান ও স্বার্থ সংরক্ষণের অনুশীল দেখতে চাইবো না।
তরুণ রাজনীতিকরা ব্যক্তিগতভাবেও ফান্ড কালেক্ট করতে পারেন রাজনীতি করার জন্য। খুবই ভাল উদাহরণ হবে এটি। কিন্তু এক্ষেত্রে কথা একটিই। জনগণকে জানতে হবে তিনি কোথা থেকে টাকা নিচ্ছেন এবং কিভাবে নিচ্ছেন। অন্যথায় গোপনে তিনি কার কাছে দায়বদ্ধ হয়ে থাকছেন এবং ক্ষমতাবান হলে সেই দায় কিভাবে মেটাচ্ছেন আমাদের অজানা থেকে যাবে, যা-ই মূলত দুর্নীতি।
 
আমার মনে হয়, উদ্যোগ দুই দিক থেকেই নেয়া উচিত। তরুণ রাজনীতিকরা নিজেরা জানাবেন তারা কোথা থেকে কত টাকা কিভাবে ফান্ড নিচ্ছেন।
 
আমরা যারা নতুন রাজনৈতিক দলের শুভাকাঙ্খী নাগরিক তাদের উচিত এই তরুণদের যারা রাজনীতি করবেন তাদের জন্য নিজেদের পকেট থেকে সাধ্যমত অনুদান নিয়ে হাজির হওয়া (যা অবশ্যই স্বচ্ছতার সাথে রাজনীতিকরা রিসিভ করবেন এবং হিসাব দেবেন)। তাদেরকে তো চলতে হবে, পরিবার চালাতে হবে।
যদি সচ্ছভাবে তারা তাদের জীবন নির্বাহের সুযোগ পান তাহলে অনেকেই খারাপ কাজে জড়াবেন না।
 
কিন্তু যদি এদের কেউ কেউ রাজনীতিকে জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে গ্রহণ করেন বা করতে বাধ্য হোন, তাহলে আমাদের আর 'নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের' আশা করে তেমন কোন লাভ হবে না।