Image description

মধ্যরাতে হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের। একের পর এক গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বাড়িঘর। আতঙ্কে অনেকে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। এ ঘটনায় সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

আজ শুক্রবার রাত ১টা ৩৬ মিনিটের দিকে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার বাসিন্দা ফারুক শরিফ বলেন, গভীর রাতে হঠাৎ বিকট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। এরপর সীমান্তের ওপার থেকে মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। এ সময় ঘরবাড়ি ও মাটি কেঁপে ওঠে।

হ্নীলা মুছনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ফাইসেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে বোমা বিস্ফোরণের শব্দে রাতে ঘরে থাকতেও ভয় লাগে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণগুলো মিয়ানমারের ঠিক কোন এলাকায় এবং কী কারণে ঘটেছে, তা তারা জানেন না। তবে তাদের ধারণা, মিয়ানমারের জান্তা সরকার বিমান হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।

বিজিবিও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম (জি) জানান, ৩০ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১টা ৩৬ মিনিটে উখিয়া ব্যাটালিয়নের আওতাধীন খারাংখালী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, খারাংখালী বিওপির বিআরএম-১৫ থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার উত্তর-পূর্বে, বিওপি থেকে প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০০ গজ মিয়ানমারের ভেতরে প্রমাচংওয়া এলাকার ত্রিমুখী মোহনা নামক স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

বিজিবির প্রাথমিক ধারণা, নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে আরাকান আর্মি (এএ) এ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

 

সীমান্তের সংঘাতে প্রাণ গেছে শিশুর

সীমান্তের ওপারের সংঘাতের প্রভাব এর আগেও বাংলাদেশে প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের তেচ্ছি ব্রিজ সীমান্ত এলাকায় খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় ১২ বছর বয়সী শিশু হুজাইফা আফনান।

আগের রাত থেকেই সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি চলছিল। ভোরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হওয়ায় ঘর থেকে বের হয়েছিল শিশুটি। পরে আবার গোলাগুলি শুরু হলে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।

এর আগেও সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষের সময় বাংলাদেশ অংশে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। চলতি বছরের ১০ আগস্ট রাত ১০টার পর হ্নীলা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকেও একের পর এক গুলির শব্দ শোনার কথা জানিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে কক্সবাজারের রামু সেক্টরের আওতাধীন নাইক্ষ্যংছড়ির ৬২ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত প্রায় ১৭৪ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

রাখাইনে সংঘাতের প্রভাব সীমান্তে

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর মংডু শহরসহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭১ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে আরাকান আর্মি।

এরপর থেকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সংঘাতের প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে গোলাগুলি, মর্টারশেল ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও।