ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রোগী পরিবহনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দৌরাত্ম্য কমাতে চালু করা হয়েছিল বুথভিত্তিক অ্যাপস ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য ছিল দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা এবং রোগী পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন ওই ব্যবস্থাতেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচল নিয়ন্ত্রণের পুরোনো প্রবণতা পুরোপুরি চালু ছিল। বরং অ্যাপের নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে সার্ভিস চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে রোগীর স্বজনদের ব্যয় বাড়তে থাকে। হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ঘিরে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতার নাম বেরিয়ে আসছে। এদের মধ্যে ঢামেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর, ঢামেক শাখার সাধারণ সম্পাদক ইমন এবং হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আজিম ও সাধারণ সম্পাদক শিপন মিয়ার নাম এসেছে। এই পাঁচজনই নিয়ন্ত্রণ করেন ঢামেক এলাকার অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট।
এদিকে ঢামেকে মঙ্গলবার থেকে ধর্মঘট পালন করছিলেন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। গতকাল হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট সাত দিনের জন্য প্রত্যাহার করা হয়।
ঢামেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই পাঁচজন মিলে ঢামেক হাসপাতালে গত ২ জুলাই থেকে বুথভিত্তিক অ্যাপস ব্যবস্থা চালু করে। এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির গাড়িগুলো। সংগঠনটির অধীনে প্রায় ১৩৬টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। অ্যাপে দেখানো ভাড়ার সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট যোগ করে তারা অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। এর সঙ্গে হুইলচেয়ার, সাপোর্ট স্টাফ ও বকশিশের নামে বাড়তি টাকাও নেওয়া হয়। আর এই সিন্ডিকেটের বাইরে থেকে তুলনামূলক কম ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স নেওয়ার সুযোগ তারা বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন রোগীর স্বজনরা।
এক রোগীর স্বজন অ্যাম্বুলেন্সের জন্য বুথে যান। সেখানে অ্যাপে ভাড়া দেখানো হয় ২ হাজার ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট বাবদ আরও ২০০ টাকা যোগ করে মোট ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ আগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ঢাকার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যেত।
জিসান নামে রোগীর স্বজন জানান, ঢামেক থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় যেতে অ্যাপে ভাড়া দেখানো হয় ৩ হাজার ৮৬৪ টাকা। সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট বাবদ আরও ৩৩৬ টাকা যোগ করে নেওয়া হয় ৪ হাজার ২০০ টাকা। বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিলে একই পথে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় যাওয়া সম্ভব।
এক মালিকের অভিযোগ, অ্যাপ পরিচালনাকারীরা মোট ভাড়ার ৮ শতাংশ কমিশন কেটে নেন। আর অ্যাপে গাড়ি অন্তর্ভুক্ত করতে গাড়িপ্রতি ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। আবার ওই অ্যাপে যুক্ত না থাকলে ঢামেক থেকে রোগী নেওয়ারও সুযোগ নেই।
জানতে চাইলে ঢামেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, আমরা কোনো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করি না। এখানে হাজার হাজার অ্যাম্বুলেন্স বিনা বাধায় রোগী আনা-নেওয়া করে থাকে।
ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারি জায়গায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা করার সুযোগ নেই। আর জরুরি বিভাগের সামনে অল্প একটু জায়গায় প্রতিদিন ২০-৩০টি অ্যাম্বুলেন্স ঘোরাঘুরি করছিল, এতে রোগীদের ভোগান্তি হতো এবং অরাজকতা ছিল। তাই আমরা তাদের নিষেধ করে দিয়েছি।
ঢামেক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমন আলী বলেন, আমি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করি, এর কোনো প্রমাণ কেউই দিতে পারবে না।
জানা যায়, উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ঢামেকে ছুটে আসেন হাজারো রোগী ও তাদের স্বজন। তবে এখানে ঢোকা সহজ হলেও রোগী নিয়ে বের হওয়া কঠিন। কারণ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হাতে রীতিমতো জিম্মি এ হাসপাতাল। সিন্ডিকেট সদস্যদের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেলের রোগী নিতে পারে না। আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আদায় করা হয় ইচ্ছামতো ভাড়া। গত ১ অক্টোবর ঢামেক থেকে ধানমন্ডির পপুলারে যেতে ভাড়া নেওয়া হয় আড়াই হাজার টাকা। একইভাবে ২ অক্টোবর পল্লবী-১২ পর্যন্ত যেতে ভাড়া ২ হাজার ৮০০ টাকা। একই দিন শ্যামলী পর্যন্ত আরেক ট্রিপের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ঢামেক থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেও হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়।
এদিকে ঢামেকে আটটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি অচল। সচল ছয়টির পাঁচটি সাধারণ এবং একটি আইসিইউ সাপোর্টেড অ্যাম্বুলেন্স। জোরালো তদবির ছাড়া এসব অ্যাম্বুলেন্সের সেবা পাওয়া সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে সান্ধ্যকালীন সরকারি চালক-সহকারীরা মিলে রাজধানীর আশপাশে টাকার বিনিময়ে রোগী পরিবহন করে থাকেন বলে জানা গেছে।