Image description

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা’ (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ব্যাপক জালিয়াতি ও শতকোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের এক বিষাদময় চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী শত আশা নিয়ে অংশ নিতে এলেও কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, জালিয়াতি, প্রশ্নফাঁস এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে তারা চরম ভোগান্তি ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা রাজধানীতে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস দিলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।

মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্ব পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন পেশ করার আগেই ১৬ অক্টোবর তড়িঘড়িভাবে নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। যে নিয়োগ কমিটির হাত দিয়ে প্রশ্নফাঁস হয়েছে ওই কমিটির কোনো পরিবর্তন না করে তাদের অধীনেই পরীক্ষাটি নেওয়া হয়।

যা নিয়ে ছিল ব্যাপক সমালোচনা। সমালোচনায় কান না দিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাটি নেয়। অবশেষে দেখা গেলো, পুনরায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, এবার প্রকাশিত প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল ঘিরে চরম অনিয়ম ও কারচুপির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকা এবং ফাঁকা ওএমআর শিট জমা দিয়েও প্রার্থীরা পাস করেছেন বলে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশের সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

এই পরীক্ষার আগে গত ১৪ অক্টোবর শীর্ষনিউজ ডটকম-এ প্রকাশিত “একই নিয়োগ কমিটির অধীনে আবারও পরীক্ষার আয়োজন! যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি, ৭০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য এবং যারা জড়িত” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে এই মর্মে আগাম আভাস দেওয়া হয়েছিল যে, “এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়; খাতা বা রোল নম্বর পরিবর্তনসহ ভিন্ন পদ্ধতিতে পূর্ব নির্ধারিত প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। ১৬ অক্টোবরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপা হবে সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে। এর আগে ১০ অক্টোবরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপা হয়েছিল মতিঝিলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যালয়ে। তবে যেহেতু ভিন্ন পদ্ধতিতে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত প্রার্থীদের পার করিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাই এবার আর প্রশ্নফাঁসের প্রয়োজনও হবে না। অন্য প্রক্রিয়ায় পছন্দের প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনা হবে। ” অবশেষে শীর্ষনিউজের পূর্বাভাসই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করছেন।

ফাঁকা ওএমআর ও অনুপস্থিত প্রার্থীদের পাসের গুরুতর অভিযোগ
গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ (শুক্রবার) রাজধানীর ৯৬টি কেন্দ্রে পুনরায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষা গ্রহণের পর, দ্রুততম সময়ে ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফলাফল প্রকাশ করে। ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে প্রকাশিত এই ফলাফলে মোট ৫,৩৮৬ জন প্রার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।
ফলাফল প্রকাশের পর পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ ফেটে পড়েন। পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজে ছবি ও রোল নম্বরসহ একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসতে শুরু করে:

ফাঁকা ওএমআর শিট জমা: পরীক্ষার হলে ৫ থেকে ৭টি মাত্র বৃত্ত ভরাট করে কিংবা পুরোপুরি ফাঁকা ঙগজ শিট জমা দিয়েও একাধিক প্রার্থীর রোল নম্বর রেজাল্ট শিটে এসেছে বলে দাবি করেছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী পরীক্ষার্থী। নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর নিয়াজ মোর্শেদ নয়ন নামে একজন চাকরিপ্রার্থী জানিয়েছেন, “ভাইরাল হওয়া সাদা খাতা জমা দানকারীর রোল, আর পাবলিশ হওয়া রেজাল্টসিটে নাম আশা রোল নাম্বার একই। গতকাল কি মনে করে স্ক্রিনশর্ট নিয়ে রেখেছিলাম। আজ কৌতুলবশত রোল মিলাতে গিয়ে আমি বোকা হয়ে গেলাম। কোন দেশে বাস করি, এটা কিভাবে সম্ভব? সাদা খাতা জমা দিয়ে কীভাবে রেজাল্ট আসে? এরচেয়ে প্রশ্নফাঁস-ই তো ভালো ছিলো!”
পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও পাস: পরীক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন না কিংবা অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন এমন রোলের প্রার্থীও চূড়ান্ত উত্তীর্ণের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ১১০১৯৪২৪ নম্বর রোলসহ বেশ কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা না দিয়েই পাসের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আবদুল্লাহ জাহিন নামে এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, “আমার আগের জন আসেইনি কিন্তু পাস আসলো। আমার লাস্টে ৯০। মগবাজার বিটিসিএল কলেজে পরীক্ষা দিয়েছি। রুম ছিলো ৪০৫। ভবন ছিলো ৪। ”

কেন্দ্রে ডিউটির প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া: অনেক কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদেরও অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কয়েকজন শিক্ষকের দাবি, পরীক্ষা চলাকালীন ফাঁকা বা অনুপস্থিত প্রার্থীর ঘরে ‘অ্যাবসেন্ট’ (অনংবহঃ) লিখতে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছিল।

পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন, ২৪২টি পদের বিপরীতে যেখানে হাজার হাজার মেধাবী চাকরিপ্রার্থী কঠোর পরিশ্রম করছেন, সেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে যদি এভাবে ওএমআর ফাঁকা জমা দিয়ে প্রার্থী পাস করিয়ে দেওয়া হয়, তবে এই নিয়োগের স্বচ্ছতা কোথায়?

‘মন্ত্রী রাত জেগে প্রশ্ন পাহারা দেওয়া, নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া’
স্থগিত হওয়া পরীক্ষাটি দ্রুততম সময়ে গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) বিকেল ৩টায় রাজধানীর ৯৬টি কেন্দ্রে পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ অক্টোবরের পরীক্ষার আগে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং ঘোষণা দেন- পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া তিনি নিজে সচিবালয়ে রাত জেগে তদারকি করছেন। তিনি পরীক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানান।

তবে আগের অভিযুক্ত নিয়োগ কমিটিকে বহাল রেখে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। ১৬ অক্টোবর পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, “যে দেশে মন্ত্রীকে রাত জেগে প্রশ্ন পাহারা দিতে হয়, সেখানে সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার সার্বিক স্বচ্ছতা কোথায়?”

নরসিংদী থেকে পরীক্ষা দিতে আসা শফিকুর রহমান বলেন, “গত সপ্তাহে ফ্রেশ মাইন্ডে পরীক্ষা দিতে এসে শুনলাম বাতিল। আজ আবার টেনশন নিয়ে পরীক্ষা দিলাম। যে দেশে মন্ত্রীকে রাত জেগে প্রশ্ন পাহারা দিতে হয়, সেখানে ব্যবস্থার গলদ কোথায় বুঝতে হবে। কঠোর শাস্তি না হলে এসব বন্ধ হবে না। ”
আহমেদ হোসেন নামে একজন প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেছেন, “সর্ষের মধ্যেই ভূত আছে। মন্ত্রী নিজেই এসবের সঙ্গে জড়িত। তা না-হলে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা উদঘাটন না করে, নিয়োগ কমিটি পরিবর্তন না করে তড়িঘড়ি কেন আবার পরীক্ষার আয়োজন করা হলো?”

গ্রেফতার ৮ জন, মূল উৎস অধরা
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে নেমে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) অভিযান চালিয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতারক চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। পরবর্তীতে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু এদের কেউই যুব উন্নয়নের নন।
প্রথমে যাদের গ্রেফতার করা হয় এরা হলেন: ১. মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, পরিবেশ অধিদপ্তর। ২. এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), কম্পিউটার অপারেটর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ৩. নূর মোহাম্মদ (৩০), অফিস সহায়ক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ৪. জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ৫. আসাদুল ইসলাম (৩৩), অফিস সহায়ক, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ৬. মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), চাকরিপ্রত্যাশী (পূর্বে প্রতারিত হয়ে চক্রে যোগ দেন)। ৭. মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), চাকরিপ্রত্যাশী। মামলাটি পরবর্তীতে সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়। গত ২১ অক্টোবর সিআইডি যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁসের দায়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকিরকে গ্রেফতার করে। কিন্তু এরা কে কীভাবে যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত, যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস কীভাবে হলো- এসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাই এসআরবি অথবা সিআইডির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।

প্রথম দফায় সাতজনকে গ্রেফতারের পরে ১৬ অক্টোবর বিকেলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, এই চক্রটি গত ৩-৪ বছর ধরে ডিজিটাল ডিভাইস ও চ্যাটের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি করে আসছিল। ৩য় শ্রেণির চাকরির জন্য ৮-১০ লাখ টাকা এবং ২য় শ্রেণির জন্য ১৫-২০ লাখ টাকার চুক্তি করা হতো। চুক্তি অনুযায়ী প্রার্থীদের থেকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ব্যাংকের চেক এবং মূল শিক্ষাগত সনদ জামানত রাখা হতো। পরীক্ষার হলে কানের ভেতরে সূক্ষ্ম ডিভাইস ঢুকিয়ে দিয়ে উত্তর সাপ্লাই করা হতো।

গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি স্ট্যাম্প, ১৯টি প্রবেশপত্র, ১০টি মূল সনদ, ব্যাংকের চেক ও মোবাইল জব্দ করা হলেও প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কোথায় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নফাঁস কীভাবে হয়েছে, কারা এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত, এর কোনো সদুত্তর মেলেনি।

তদন্ত কমিটির ধীরগতি ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা
ঘটনার তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, মূল প্রভাবশালী অপরাধীদের আড়াল করে নিরপরাধ ব্যক্তিবর্গের ওপর দায় চাপানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

কড়া নিরাপত্তার কদর্য চিত্র: এক কক্ষেই প্রশ্ন ছাপা, সেখান থেকেই ফাঁস
প্রশ্নপত্র তৈরির পেছনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত ৯ অক্টোবর রাতে দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে একটি কক্ষে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ১২টি হাইস্পিড ফটোকপি মেশিনে ছাপা হচ্ছিল। ওই কক্ষে নিয়োগ কমিটির ৫ জন সদস্য এবং ‘ওএমআরডিএম’ নামক ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সবার মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডি এম আতিকুর রহমানের হাতে সর্বক্ষণ মোবাইল ছিল এবং তিনি একাধিকবার কক্ষে আসা-যাওয়া করেন বলে কর্মচারীরা জানান। পরবর্তীতে ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্রের ছবি ছড়িয়ে পড়ে।

শত কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য!
শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ২৪২টি পদের বিপরীতে মোট প্রায় শত কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে। এই টাকার মূল অংশটি ঢুকেছে নিয়োগ দুর্নীতির মূল হোতা যারা, তাদের পকেটে। এই সিন্ডিকেট পেয়েছে জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে কমপক্ষে ৭০ কোটি টাকা। তবে দালালরা নিয়েছে ৩০-৩৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি। দালালদের এই হিসাব সামনে আনলে নিয়োগ বাণিজ্যের মোট টাকার অংক দাঁড়াবে প্রায় শত কোটি টাকা। নামেমাত্র এই নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজনটা ছিল চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ অক্টোবর নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে সারাদেশ থেকে মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় আসেন। রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এদিন সকালে পরীক্ষা শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। ফলে মাইকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ওইদিনই পরে ঘোষণা দেওয়া হয়, স্থগিত হওয়া এই পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নিয়োগ কমিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী আগের নিয়োগ কমিটির অধীনেই পরীক্ষাটির আয়োজন করা হয়। ফলে নিয়োগ পরীক্ষাটি লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে আসলেই যে প্রতারণা, এটা আবারও প্রমাণ করলো কর্তৃপক্ষ। আর এ কারণেই পরের দিন অর্থাৎ ১৬ অক্টোবরের নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিতি ছিল এক তৃতীয়াংশেরও কম। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রহসনের বিষয়টা যারা বুঝতে পেরেছেন এদের কেউই আর পরীক্ষা দিতে আসেননি।

নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত যারা
প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, নিয়োগ কমিটির সভাপতি ডি এম আতিকুর রহমান ছাড়াও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের পিএস মো. কবির খাঁনও এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তা ডিএম আতিকুর রহমান একসময় স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে কাজ করেছেন। কবির খাঁনেরও মূল চাকরি স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে। কবির খানকে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রেষণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের পিএস পদে এনেছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে বিশেষ মহল আগে থেকেই। ডি এম আতিকুর রহমানকে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়। কবির খাঁন এবং আতিকুর রহমান যেহেতু স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন তাই উভয়ের পরস্পর জানা আছে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষে থাকাকালে এরা উভয়ে নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়ার মাধ্যমে অনেক অপকর্ম করেছেন। কবির খান তখনও অনেক প্রভাবশালী ছিলেন, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পিএস পদে কাজ করেছেন।
সূত্রমতে, কবির খাঁনই এই নিয়োগ বাণিজ্যের যোগ্য লোক হিসেবে আতিকুর রহমানকে পছন্দ করেন। আতিকুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জে। পরিচালক (প্রশাসন) ডি এম আতিকুর রহমান, পিএস কবির খাঁন, প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ছাড়াও এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কেন্দ্রীক একজন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ব্যবসায়ী এবং সরকারের অন্য একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী। আর এ কারণেই নিয়োগ বাণিজ্য বাবদ সংগ্রহ করা বড় অংকের অর্থ জায়েজ করার জন্য অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠে সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়, নিয়োগ কমিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। এমনকি প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে পাঁচ সদস্যের যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে ওই কমিটির কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয় শুরুতেই। যেসব ঘটনা এবং যারা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তদন্ত কমিটি সেদিকে না গিয়ে অন্য নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপানোর কৌশল নেয় শুরু থেকে। যে কারণে প্রশ্নফাঁসে জড়িত আসল ব্যক্তিরা কেউই এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি।

শীর্ষনিউজ