মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আত্মসমালোচনা ও ভুল সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। তিনি বলেছেন, নিজেদের ভুল নিজেরা সংশোধন না করলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ নিতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা অযাচিত চাপ ও সংকটের মুখে পড়তে পারে। ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) ফেসবুকে এই কথা বলেন তিনি।
আজাহারী লিখেন, এ দেশে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। হাজারো আলিম, আলিমা ও দ্বীনদার প্রজন্ম গড়ে তোলার নেপথ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অবদান রাখছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ ও আস্থাশীল করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ বাস্তবতায় প্রভাবশালী আলিম, দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং মাদ্রাসা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা করা। আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো নিজেরাই সংশোধন না করি, তাহলে একসময় দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন সামগ্রিকভাবে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত চাপ ও সংকটের মুখে পড়তে পারে।
বিভিন্ন সময় আমরা মিডিয়ায় উঠে আসতে দেখেছি যে দেশের নানা প্রান্তে গণহারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অসংখ্য মাদ্রাসা এবং হিফজখানা গড়ে উঠেছে যেগুলোতে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই, যথাযথ তদারকি নেই। নেই মানসম্পন্ন পরিবেশ কিংবা উন্নত পাঠদান ব্যবস্থা। প্রায়শই এসব প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত নানা অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; যা মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
তিনি লিখেন, ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অনুমোদন, নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ অবকাঠামো, নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, দক্ষ পরিচালনা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণ ও পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে শিশুর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকাও আবশ্যক। শিশুদের বয়স, মানসিক বিকাশ, আবেগ ও শেখার ধরন একেক রকম। তাই একজন শিক্ষককে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না; শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সঙ্গে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণ করার সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো পদক্ষেপও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
মাদ্রাসাগুলোতে শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত ও টর্চারের ঘটনাও মাঝে মাঝেই ঘটে। এই ঘটনাগুলোও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি জনমনে নেতিবাচকতা জন্ম দেয়। এমন কোনো আচরণ, যা শিশুর মনে ভয়, অপমান বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে— তা শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে। জোর করে বিদ্যা চাপিয়ে দেওয়ার নাম শিক্ষা নয়, শিক্ষা হলো আপনার সন্তানের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশ।
এক্ষেত্রে প্রতিটি মাদ্রাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বা চাইল্ড সেফটি পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের পদ্ধতি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি। গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা জরুরি। শাসনের নামে ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একান্তে সাক্ষাৎ, ব্যক্তিগত বার্তা সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ ও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখতে হবে।
গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পুনরায় একই ধরনের দায়িত্বে নিয়োগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি।
এক্ষেত্রে আলিম-উলামা, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে সীমিত সামর্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা নয়; বরং তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি নিরাপদ, মানসম্মত ও আস্থাশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, আমাদের এই পর্যালোচনা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নয়; বরং মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ঐতিহ্য বা সুনামে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও পরিচালনব্যবস্থার স্বচ্ছতার মধ্যেও নিহিত। নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়া দুর্বলতা নয়; বরং দায়িত্বশীলতার পরিচয়। দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা ও সমাজের আস্থা অটুট রাখতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।