ঢাকার বুড়িগঙ্গা থেকে গত ২৩ আগস্ট ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে এক নারী, এক শিশু এবং এক তরুণ ও এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। নারীর গলায় কালো কাপড় প্যাঁচানো ছিল। শিশুটির মরদেহ প্যাঁচানো ছিল ওড়না দিয়ে। তরুণ ও তরুণীর হাত একসঙ্গে বাঁধা ছিল, দুজনের শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। পুলিশের ধারণা, তাঁদের হত্যা করে লাশ গুম করতে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পরিচয় না মেলায় ১১ দিন পর চারটি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এর আগে গত বছরের ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি নদী থেকে বাঁশের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর পরনে কোনো কাপড় ছিল না। ওই এলাকায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরে থানায় সংরক্ষিত ছবি দেখে স্বজনেরা তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে—ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
নারীর গলায় কালো কাপড় প্যাঁচানো ছিল। শিশুটির মরদেহ প্যাঁচানো ছিল ওড়না দিয়ে। তরুণ ও তরুণীর হাত একসঙ্গে বাঁধা ছিল, দুজনের শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন।
দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৪৩০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ বছর ৯ মাসে উদ্ধার হয়েছে ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ।
উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বিভিন্নভাবে নদীতে পড়ে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে।
নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে ও গ্রেপ্তার এড়াতে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিচ্ছে অপরাধীরা। লাশ গুমের জন্য নদীকে তারা ‘নিরাপদ স্থান’ মনে করে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বিভিন্নভাবে নদীতে পড়ে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে।
৫ বছর ৯ মাসের মোট চিত্র
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। নারী ও শিশুর মরদেহও রয়েছে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন থানায় ৩৯২টি হত্যা মামলা এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনায় ২৬টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া মাছ ধরতে, ঘুরতে ও গোসল করতে গিয়ে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নৌ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৭টি।
নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের দেওয়া হিসাবে, এ সময়ে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হয়নি ৭৫৫ জনের।
উদ্ধার হওয়া লাশের আলামত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। উদ্ধার হওয়া সব মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ছবি তুলে থানায় রাখা হয়। দাফনের পর কেউ থানায় এসে পরিচয় শনাক্ত করলে তদন্ত সাপেক্ষে সে অনুযায়ী মামলা ও তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের দেওয়া হিসাবে, এ সময়ে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হয়নি ৭৫৫ জনের।
২০২১-২৫: ৫ বছরে ২,০৬৪ মরদেহ
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৩১৮টি, ২০২২ সালে ৩৬০টি, ২০২৩ সালে ৪০৫টি, ২০২৪ সালে ৪৪০টি এবং ২০২৫ সালে ৫৪১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পাঁচ বছরে উদ্ধার হয়েছে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ। এর মধ্যে খুন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় হত্যা মামলা হয়েছে ৩৩৫টি ঘটনায়।
এ সময়ের মধ্যে প্রতিবছরই উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে ২০২৫ সালে।
চলতি বছরের ৯ মাস: ৪৩০ মরদেহ
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৪৩০টি মরদেহের মধ্যে ৩১৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। বাকি ১১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম তাঁদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে।
এই ৯ মাসে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে ৫৭টি। এ ছাড়া গোসল করতে গিয়ে ১১৬ জন, ভ্রমণে বা ঘুরতে গিয়ে ৫৭ জন, নৌ দুর্ঘটনায় ৩৮ জন, মাছ ধরতে গিয়ে ৩৭ জন, নৌযান থেকে পড়ে ১৯ জন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২ জন এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব কারণে মোট মারা গেছেন ২৭০ জন।
আরও ১০৪ জনের মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায়নি বলে উল্লেখ রয়েছে পুলিশের দেওয়া তথ্যে। এসব ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক চিত্র
নৌ পুলিশ সারা দেশের নদীপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করেছে। এগুলো হলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, খুলনা ও সিলেট।
ঢাকা অঞ্চলের আওতায় রয়েছে বুড়িগঙ্গা, খিলক্ষেতসংলগ্ন বালু নদ, শীতলক্ষ্যার একাংশ, দোহারসংলগ্ন পদ্মা এবং নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাব পাওয়া গেছে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই ৩ বছর ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে, ৩৯৮টি। দ্বিতীয় অবস্থানে নারায়ণগঞ্জ, ২৫৩টি। সবচেয়ে কম উদ্ধার হয়েছে সিলেটে, ২০টি।
একই সময়ে বরিশালে ২১১টি, রাজশাহীতে ১৭৭টি, চট্টগ্রামে ১৬৭টি, ফরিদপুরে ১৪৯টি, চাঁদপুরে ১২৭টি, খুলনায় ১২৭টি, কিশোরগঞ্জে ৯৪টি এবং টাঙ্গাইলে ৯৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেও সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে, ৭৮টি। দ্বিতীয় অবস্থানে বরিশাল, ৬৩টি। এরপর নারায়ণগঞ্জে ৬০টি, রাজশাহীতে ৫৫টি, ফরিদপুরে ৫০টি, টাঙ্গাইলে ২৯টি, খুলনায় ২৩টি এবং চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও কিশোরগঞ্জে ২২টি করে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সিলেটে উদ্ধার হয়েছে ৬টি।
নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক ঘটনায় নদীতে মরদেহ ভেসে ওঠার আগেই পচন ধরে। আঙুলের ছাপ মুছে যায়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। কখনো মানুষের কঙ্কালও উদ্ধার করা হয়।
পরিচয় না মেলায় তদন্তে বাধা
নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক ঘটনায় নদীতে মরদেহ ভেসে ওঠার আগেই পচন ধরে। আঙুলের ছাপ মুছে যায়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। কখনো মানুষের কঙ্কালও উদ্ধার করা হয়। মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মিললেও হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। আবার বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচয় জানা গেলেও পচনের কারণে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায় না।
গত ২৩ আগস্ট বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের মধ্যে কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজ এলাকার তীরে পাওয়া যায় ৩০ বছর বয়সী এক নারী ও তিন-চার বছরের এক শিশুর লাশ। কালিন্দীর মাদারীপুর ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় তরুণ ও তরুণীর লাশ। মরদেহগুলোতে পচন ধরেছিল। দাবিদার না থাকায় ১১ দিন পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সেগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নিজেদের আড়াল করতে খুনিরা হত্যা করে লাশগুলো নদীতে ফেলে দিয়েছে। নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় এবং তরুণ ও তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। লাশগুলোর ছবি ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। তাঁদের খোঁজে কেউ থানায় গেলে ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় জানার চেষ্টা করা হবে।
ছবি ও মোজা দেখে পরিচয় শনাক্ত
গত বছরের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কাঁচপুর নৌ পুলিশ মরদেহের ছবি তুলে রাখে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাঁকে দাফন করা হয়।
পরে পুলিশের সংরক্ষিত ছবি ও পায়ের মোজা দেখে মরদেহটি জব্বার হাওলাদারের (৪৫) বলে শনাক্ত করেন তাঁর ছেলে মাহবুবুর রহমান। জব্বার পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। এ ঘটনায় মাহবুবুর রহমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান কাঁচপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মাইনুল ইসলাম। তিনি এখন নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত।
মাইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, গত বছরের ১৩ জানুয়ারি অটোরিকশা চালাতে বেরিয়ে জব্বার আর বাড়ি ফেরেননি। সঙ্গে তাঁর মুঠোফোন ছিল। সেই মুঠোফোনের সূত্র ধরে আল আমিন নামের এক যুবককে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন জানান, শাওন নামের এক যুবক তাঁর কাছে ফোনটি বিক্রি করেছেন।
পরে শাওনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মাইনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, শাওন হত্যার কথা স্বীকার করে জানান, সন্ধ্যার পর অটোরিকশা ছিনতাই করতে জব্বারকে কৌশলে কোমল পানীয়ের সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য ও উচ্চমাত্রার ঘুমের বড়ি মিশিয়ে খাইয়ে অচেতন করা হয়। পরে অচেতন অবস্থায় তাঁকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদমজী ঘাট থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। অটোরিকশা ও মুঠোফোন বিক্রির টাকা সাতজন ভাগ করে নেন।
মাইনুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় জড়িত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে জব্বারের অটোরিকশা ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা সংঘবদ্ধ অটোরিকশা চুরি ও ছিনতাই চক্রের সদস্য।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, ময়নাতদন্তে যেসব মৃত্যু হত্যাকাণ্ড বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেসব প্রতিবেদনে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ, মাথায় আঘাত এবং পানিতে ফেলে হত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া হাত, পা, গলা ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটা, জখমযুক্ত এবং বস্তাবন্দী লাশও উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এসব ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়।
ময়নাতদন্তে যা পাওয়া যায়
নৌ পুলিশ সূত্র জানায়, নদী থেকে উদ্ধার মরদেহে আঘাতের চিহ্ন না পাওয়া গেলে কিংবা পচন ধরে গেলে সাধারণত থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। তবে পরিচয় জানা না গেলেও মরদেহের আলামত, অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণে ঘটনা সন্দেহজনক মনে হলে নৌ পুলিশ বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা করে।
তদন্ত ও ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। নৌ পুলিশ সেই মামলার তদন্ত করে।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, ময়নাতদন্তে যেসব মৃত্যু হত্যাকাণ্ড বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেসব প্রতিবেদনে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ, মাথায় আঘাত এবং পানিতে ফেলে হত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া হাত, পা, গলা ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটা, জখমযুক্ত এবং বস্তাবন্দী লাশও উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এসব ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়।
ময়নাতদন্ত–বিশেষজ্ঞদের সমিতি দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় নদ-নদী থেকে পচন ধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব মরদেহে আঘাত বা কাটা আঘাতের চিহ্ন থাকলেও পচনের কারণে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। মাছ বা পোকামাকড় মরদেহের অংশ খেয়ে ফেললেও আলামত নষ্ট হয়। তখন মৃত্যুর কারণ নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের দিনে পানিতে ডোবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাশ ভেসে ওঠে। তখন উদ্ধার করা গেলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যায়।
অধ্যাপক মোস্তাক রহিম বলেন, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ল্যাব নেই। এসব চালু হলে মরদেহে পচন ধরলেও মৃত্যুর বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা যাবে।
নৌ পুলিশ সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন থানায় হওয়া নিখোঁজসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) সংগ্রহ করে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে নৌ পুলিশ। এসব জিডির সূত্র ধরে পরে অনেক সময় নদী থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে বেশি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের প্রধান বলেন—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ সবচেয়ে জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ। এসব এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বেশি। সংগত কারণে অপরাধের মাত্রাও বেশি।
ঘাটসহ সম্ভাব্য স্থানে নজরদারি
নৌ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, মরদেহ শনাক্ত না হলে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করা যায় না। নদী থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা হত্যা মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক কলহ, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব ও পরকীয়া সম্পর্কের জেরে এবং যানবাহন ছিনিয়ে নিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য হত্যার পর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে বেশি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের প্রধান বলেন—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ সবচেয়ে জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ। এসব এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বেশি। সংগত কারণে অপরাধের মাত্রাও বেশি।
নদীতে লাশ ফেলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম বলেন, দূরবর্তী নির্জন এলাকায় লাশ ফেলে দেওয়া হয়। পরে তা স্রোতে ভেসে আসে এবং উদ্ধার হয়। কোন কোন পয়েন্ট দিয়ে লাশ ফেলা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নদীর ঘাট, নদীসংলগ্ন মার্কেট ও রাস্তায় সারাক্ষণ গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ঘাটসহ লাশ ফেলার সম্ভাব্য কিছু স্থান চিহ্নিত করে সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।
অপরাধীরা মনে করে, লাশ ভেসে উঠলেও তাতে পচন ধরবে এবং স্রোতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাবে। তখন পরিচয় শনাক্ত হবে না, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে। এ ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক তথ্য সংগ্রহ ও মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্ষা মৌসুমে সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারে দাঁড়ায়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌপথে নিয়মিত নৌযান চলে। এই বিশাল নদীপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নৌ পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, লাশ ফেলার নিরাপদ স্থান হিসেবে নদীপথকে বেছে নিয়েছে পেশাদার অপরাধীরা। ধর্ষণ ও খুনের পর লাশ গুম করতে পরিকল্পিতভাবে ও সুকৌশলে নির্জন স্থান দিয়ে নদীতে ফেলা হয়। এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরও লাশ গুম করতেও নদী ব্যবহার করা হয়েছে।
অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, অপরাধীরা মনে করে, লাশ ভেসে উঠলেও তাতে পচন ধরবে এবং স্রোতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাবে। তখন পরিচয় শনাক্ত হবে না, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে। এ ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক তথ্য সংগ্রহ ও মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। নদীতে লাশ ফেলা ঠেকাতে সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা বসানোর পরামর্শ দেন এই অপরাধবিশেষজ্ঞ।