Image description
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছে দুটি রেডিও থেরাপি যন্ত্র। এর মধ্যে ২৭ কোটি টাকায় কেনা একটি রেডিও থেরাপি যন্ত্র উদ্বোধন করা হয় গত ৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে। তবে উদ্বোধনের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রটি এখনো সচল করা যায়নি। ৩৭ কোটি টাকায় কেনা নতুন আরেকটি যন্ত্র স্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত চালু করা যায়নি সেটিও। এতে ক্যান্সারের চিকিৎসায় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে দুই মাস ধরে বন্ধ থাকা রেডিও থেরাপি সেবাও চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কবে নাগাদ নতুন কেনা যন্ত্র দুটি চালু করে রেডিও থেরাপি সেবা ফের চালু করা যাবে, তাও বলতে পারছেন না কেউ।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নতুন কেনা ‘ভেরিয়ান’ ব্র্যান্ডের রেডিও থেরাপি যন্ত্রটি গত ৪ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যন্ত্রটি চালু করা যাবে না জেনেও সেটি উদ্বোধনের আয়োজন করে।

 

হাসপাতালের রেডিও থেরাপি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নতুন কেনা লিনিয়ার এক্সিলারেটর রেডিও থেরাপি যন্ত্রটি হাসপাতালের পাঁচ নম্বর বাঙ্কারে (রেডিও থেরাপি যন্ত্র সংস্থাপনের বিশেষ সুরক্ষিত ও নিরাপদ স্থান) স্থাপন করা হয়। বাঙ্কারটি নির্মাণ করা হয়েছিল আগের যন্ত্রের সক্ষমতা অনুসারে। নতুন যন্ত্রটির বিকিরণ প্রক্ষেপণ সক্ষমতা আগেরটির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বাঙ্কারের দেয়াল ভেদ করে বিকিরণ বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। আণবিক শক্তি কমিশনের এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যন্ত্রটি এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাঙ্কার এই যন্ত্রের উপযোগী করে নির্মাণের পরেই কেবল এটি চালু করা যাবে। অন্যথায় হাসপাতালে কর্মরত অনেকেই ছড়িয়ে পড়া বিকিরণের নেতিবাচক প্রভাবে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফরুক বলেন, সক্রিয় নিরাপত্তা ছাড়া কোনো রেডিও থেরাপি যন্ত্র চালানোর সুযোগ নেই। বাঙ্কার থেকে বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের সেবাকর্মী, রোগী ও স্বজনদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। দীর্ঘদিন এবং দীর্ঘসময় যদি সুস্থ মানুষ বিকিরণ বলয়ে থাকে, তাহলে তার মাল্টি অর্গান অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। অবিবাহিতরা সন্তান উৎপাদন সক্ষমতা হারাতে পারেন; অন্তঃসত্ত্বার গর্ভের সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বোনম্যারো ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারে। এতে রক্তের উৎপাদন কমে যাবে।

অন্যদিকে নতুন কেনা অপর লিনিয়ার এক্সিলারেটর যন্ত্রটি ইলেকট্রা নির্মিত। দুটি যন্ত্রই আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন এবং দুটি যন্ত্র দিয়েই রোগীদের আইএমআরটি, আইজিআরটি ইত্যাদি বিশেষ সেবা প্রদান করা সম্ভব। কিন্তু দুটি যন্ত্রের দামের পার্থক্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। দামের এত পার্থক্য কেন জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি যন্ত্র কিনেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ; যেটির দাম ২৭ কোটি টাকা। অন্যটি কিনেছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার; যে প্রতিষ্ঠানটি আমলা নিয়ন্ত্রিত, সেটি কিনতে ব্যয় হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। এই রেডিও থেরাপি যন্ত্রটি স্থাপন করা হয়েছে দুই নম্বর বাঙ্কারে। এটির ব্যবহার উপযোগী করতে কারিগরি অনেক কাজ এখনো বাকি।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, বিপুল সংখ্যক রোগীর রেডিও থেরাপি সেবা নিশ্চিতে দুটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর কেনা হয়েছে; কিন্তু একটি যন্ত্র স্থাপনের পরে দেখা গেছে বাঙ্কারের এক দিকের দেয়াল থেকে বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ছে। দেয়ালটি আট ফুট পুরু হলেও নতুন যন্ত্রটি অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় দেয়াল ভেদ করেই বিকিরণ ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, দেয়ালটি আরও দুই ফুট পুরু করতে হবে। যেহেতু বাঙ্কারের দেয়াল করতে হয় আরসিসি ঢালাই দিয়ে, তাই কিছুটা সময়সাপেক্ষ। এটি সম্পন্ন করে যন্ত্রটি কবে চালু করা সম্ভব, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আরেকটি যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, সেটির কারিগরি কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যন্ত্রটি দ্রুত চালু করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, হাসপাতালে আরও রেডিও থেরাপি যন্ত্র প্রয়োজন। আরেকটি যন্ত্র কেনার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, শিগগিরই সেটি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নতুন যন্ত্র দুটি স্থাপনের আগে মোট ছয়টি রেডিও থেরাপি যন্ত্র ছিল। এর মধ্যে চারটি যন্ত্র অনেকদিন ধরেই বিকল হয়ে পড়ে আছে। বাকি দুটি যন্ত্রের একটি গত ২২ ডিসেম্বর এবং অন্যটি ২৩ ডিসেম্বর বিকল হয়ে যায়। এরপর থেকে রেডিও থেরাপি সেবা বন্ধ রয়েছে। এতে হাজার হাজার ক্যান্সার রোগী তাদের চিকিৎসার জন্য জরুরি এই সেবা নিতে পারছেন না।

জানা যায়, ক্যান্সার হাসপাতালে একটা সময় দিনে ৭০০ থেকে ৮৫০ জন রোগীকে রেডিও থেরাপি সেবা দেওয়া হতো, চারটি যন্ত্র বিকল হওয়ার পর সেবা নেমে আসে ৮০ থেকে ১০০ জনে। দুটি রেডিও থেরাপি যন্ত্র চলমান অবস্থায় একজন রোগীকে একটি রেডিও থেরাপি সেবা পেতে প্রায় ৬ মাস অপেক্ষা করতে হতো। এখন সেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় তাদের অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে, তা বলতে পারছেন না কেউই।

হাসপাতালের রেডিও থেরাপি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর চাপ সামলাতে এ মুহূর্তে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অন্তত ১০টি রেডিও থেরাপি যন্ত্র সচল রাখা প্রয়োজন। নতুন দুটি যন্ত্র স্থাপন হলেও কবে নাগাদ সেগুলো চালু হবে, তা অনিশ্চিত।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসার আওতায় আসা রোগীদের রেডিও থেরাপি সেবা দিতে দেশে ২৪০ থেকে ২৫০টি যন্ত্র প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যন্ত্র আছে ৩০টির কম।