
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসছে বাজেটে অগ্রাধিকার পাচ্ছে সংস্কার কার্যক্রম ও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা। এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গতানুগতি ধারাবাহিক বাজেটের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেটে আগামী অর্থবছরে ভিন্নমাত্রার পরিকল্পনা যুক্ত থাকবে, যাতে বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হয়।
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেট পরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে আট লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাজেটের আকারের এমন প্রাক্কলনের ওপর আয়-ব্যয়ের খসড়া রূপরেখা সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এই বাজেট পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
অর্থ উপদেষ্টার বাজেট বক্তব্যে অন্তর্ভুক্তির জন্য অর্থ বিভাগের দেওয়া চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে, আগামী বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি বেগবান করতে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, অসমতা হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নীতি এবং সংস্কার পরিকল্পনা, পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ড বাজেট প্রস্তাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
হিসেবে উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে তথ্য চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ পর্যন্ত প্রণয়ন করা উল্লেখযোগ্য নীতি, আইন ও পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়িত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন তুলে ধরা হবে। বর্তমান সরকারের গ্রহণ করা নীতি, আইন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা এতে উপস্থাপন করা হবে। আগামী অর্থবছর ও মধ্য মেয়াদে নেওয়া কর্মপরিকল্পনা ও সংস্কার কার্যক্রম প্রাধান্য পাবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের চাপে রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সংকটের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আগামী বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষের সুরক্ষাও নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এর জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়লে সরকারের ঋণের চাপ কম থাকবে। ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আয় দিয়েই সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। সরকারি ব্যয়ে অর্থের অপচয় কমাতে বর্তমান সরকার জোর দিয়েছে। এ বিষয়ে আগামী বাজেটে আরো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ থাকা দরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে বিশেষ নজর দিতে হবে। যাতে মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে থাকা মানুষের আয় বাড়ানো সম্ভব হয়। এ জন্য আগামী বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নজর দিতে হবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপক পরিবর্তন টের পাওয়া যাবে। তবে কী পরিবর্তন আসছে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগামী বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী আমাদের অর্থনীতি সমন্বয় করার ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংস্কার নতুন বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কর কাঠামোর পরিবর্তন এনে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। আমাদের দেশে পরোক্ষ কর অনেক বেশি। এই ধারা পরিবর্তন করে প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ আমাদের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময়ের মধ্যে যাতে সক্ষমতা অর্জন হয়।’ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের উন্নয়ন বাজেট পুরোটাই ঋণনির্ভর। এ ধরনের অর্থায়ন কাঠামো টেকসই নয়। বিশেষ করে বিদেশি ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে, যা আগামী দিনের অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।’
অগ্রাধিকার পাবে মূল্যস্ফীতি : আগামী অর্থবছর (২০২৫-২৬) শেষে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। তাই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হবে। প্রকল্পের ক্ষেত্রে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।