মর্ত্যযাত্রা শেষে আবারও কৈলাশে ফিরে গেছেন দেবী দুর্গা। আর এর মধ্য দিয়েই বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, মণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবারের পূজার উৎসবের আমেজে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতাদের মতে, কড়া নিরাপত্তা ও সর্বজনের অংশগ্রহণে পূজা পরিণত হয়েছিল সর্বজনীন এক মিলনমেলায়। কোনো ধরনের বড় অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের তাৎক্ষণিক ও যথাযথ পদক্ষেপের কারণে দেশজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত সন্তোষজনক ছিল।
এ বিষয়ে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রী শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন স্ট্রিমকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেক ভালো পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা থেকে শুরু করে সব দিক দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজার ছুটি ও অনুদান বাড়ানো হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শুধু ঢাকেশ্বরী নয়; রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মন্দিরে গিয়ে আমাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। এতে আমাদের মধ্যে শক্তি ও সাহসের সঞ্চার হয়েছে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই সর্বজনীন রাষ্ট্রের চেতনায় ১৯৭১ সালে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানের মিলিত স্রোতোধারায় বাংলাদেশ গঠিত হয়েছিল। এই দুর্গোৎসবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে মৈত্রীর বন্ধন এখনও অটুট।’
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘পূজার আগে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সার্বিকভাবে এবারের উৎসব নির্বিঘ্নে ও শান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, ‘এত ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং নিরাপদ পূজা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। পূজার আচারিক অংশটুকু হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও আনন্দ-উৎসবে শামিল হয়েছিল সব ধর্মের মানুষ। রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত মানুষ মণ্ডপে ভিড় করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল অভাবনীয় ও নিরাপদ।’
একই কথা জানিয়ে পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ‘সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা শেষ হয়েছে। দু-একটি ঘটনা ঘটলেও সরকারের তাৎক্ষণিক ও যথাযথ পদক্ষেপের কারণে কোনো বড় বিঘ্ন ঘটেনি।’
পূজার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মনিরা জানান, সারা দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য নেই। দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৪৯৬টি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ২ হাজার ৩পোটি বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি এবং ২০২৪ সালে ৩১ হাজার ৪৬১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে সারা দেশে মণ্ডপ বাড়লেও ঢাকা মহানগরীতে সংখ্যাটি অপরিবর্তিত রয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার রাজধানীতে ২৫৯টি মণ্ডপে পূজা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের সমান। তবে ২০২৪ সালের (২৫২টি) তুলনায় রাজধানীতে মণ্ডপ বেড়েছে ৭টি।
এছাড়া এবারের পূজায় বিশেষ অনুদান চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়। পাশাপাশি এবার পূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটির আবহ তৈরি হয়। মহানবমী (২০ অক্টোবর) ও বিজয়া দশমীর (২১ অক্টোবর) সাধারণ ছুটির সঙ্গে ২২ অক্টোবর নির্বাহী আদেশে ছুটি দেওয়া হয়। এর সঙ্গে পরবর্তী শুক্র ও শনিবার যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পান, যা উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর মা দুর্গা মর্ত্যে এসেছিলেন ঘোড়ায় (ঘোটকে) চড়ে এবং কৈলাশে ফিরে গেছেন নৌকায়। গত ১৫ অক্টোবর দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল। ১৬ অক্টোবর আমন্ত্রণ ও অধিবাস, ১৭ অক্টোবর সপ্তমী এবং ১৮ অক্টোবর অতিরিক্ত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দশমী পূজা শেষ হয়। এর মধ্য দিয়ে মর্ত্য ছেড়ে আবারও কৈলাশে ফিরে যান দেবী দুর্গা।