২০২২ সালের ১০ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রাম থেকে নজরুল ইসলাম কাজের জন্য সৌদি আরবে যান। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বড়, পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্য। তাঁকে পাঠাতে বাবা আব্দুল বাছির ৭ লাখ টাকা ঋণ করেন। (ডেইলি স্টার, জাগো নিউজ; প্রথম আলোকে বলেছেন ৬ লাখ) মা রহিমা বেগম বলেছেন, ছেলে গিয়েছিলেন দালালের মাধ্যমে। (বিবিসি বাংলা)
প্রায় তিন মাস পর, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া গ্রামের সুইটি আখতার বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সৌদি আরবে যান। রিক্রুটিং এজেন্সি "এস রানা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল", নিয়োগকারী "আল মাজাল আল আরাবি গ্রুপ"। তাঁর জন্ম ১১ আগস্ট ২০০১। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, দুজনই আল মাজালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সহকর্মী ছিলেন। (প্রথম আলো)
বিএমইটির তথ্যমতে, সুইটির নাম, ঠিকানা আর জন্মতারিখ রাষ্ট্রের নিজের খাতাতেই ছিল। অথচ মৃত্যুদণ্ডের ছয় দিন পরও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করেনি। সুইটির পরিবারের সঙ্গে কোনো সাংবাদিক বা সরকারি কর্মকর্তার কথা হয়েছে, এমন খবর এখনও নেই।
২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল এবং ২ আগস্ট সুইটি গ্রেপ্তার হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মক্কার একটি মসজিদে "অনৈতিক কাজ"। কাজটি কী, কোন মসজিদ, সৌদি আরব আজও বলেনি।
পরিবার গ্রেপ্তারের কথা জেনেছিল, কিন্তু কারণ জানেনি। বাবা বলেছেন, কী কারণে আটক, নজরুল জানাননি, "কিংবা আমরাও জানি না"।
ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩৬ অনুযায়ী, আটক বিদেশিকে অবিলম্বে জানাতে হয় যে তিনি নিজের দেশের কনস্যুলেটে খবর দিতে পারেন, আর কনস্যুলেট তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ও আইনজীবীর ব্যবস্থা করতে পারে। দুজনকে এই অধিকারের কথা জানানো হয়েছিল, এমন কোনো তথ্য নেই। গ্রেপ্তারের সময় দূতাবাসকে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সরকারি সূত্রগুলোই একমত নয়।
নজরুল প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন। পরিবারের ভাষ্যে, প্রতি রবিবার জেল থেকে ফোন করতেন; মা প্রথম আলোকে বলেছেন, মাসে একবার এক-দুই মিনিটের জন্য ছেলে তাদের সাথে কথা বলত । শেষ ফোন করে ১১ অক্টোবর, রবিবার; বাবাকে বলেছিলেন, তিনি সমস্যার মধ্যে আছেন।
এই সময়ে বাংলাদেশে তিনটি সরকার ক্ষমতায় ছিল: শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার (৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত), মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার (৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), এবং তারেক রহমানের বিএনপি সরকার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে)।
তিন সরকারের কোনোটির আমলেই কনস্যুলার সাক্ষাৎ, আইনজীবীর ব্যবস্থা বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি। অথচ ২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের ধারা ২৪(৩)(খ) মিশনের শ্রম উইংকে আটক কর্মীদের তথ্য রাখতে বলে, ধারা ২৭ কর্মীকে আইনগত সহায়তার অধিকার দেয়, আর ধারা ২৯ আটক কর্মীকে মিশনের সহায়তার অধিকার দেয়। দুজনই নিবন্ধিত কর্মী হয়ে থাকলে, এই দায়িত্ব দুজনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। তা পালিত হয়েছিল কি না, কোনো সরকার জানায়নি। তবে মা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বন্দিত্বের সময় পরিবারও স্থানীয় প্রশাসনের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
বিচার হয়েছে জেদ্দায়, দুজন বাংলাদেশি দোভাষী ছিলেন। (প্রথম আলো, একটি সূত্র) তবে তাঁদের আইনজীবী ছিল কি না তা এখন পর্যন্ত কেউ জানায়নি।
১৯ অক্টোবর জেদ্দার বৈঠকে সৌদি পক্ষ মৌখিকভাবে জানায়, প্রথমে নিম্ন আদালত দণ্ড দেন, পরে ১৩ বিচারকের আপিল প্যানেল মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এ তথ্য এসেছে প্রথম আলোতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনামা কর্মকর্তাদের বরাতে (একটি সূত্র); ঢাকা পোস্টও একই ধরনের সূত্রে একই কথা লিখেছে। এরপর রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর হয়।
সৌদি আইনে যেকোনো মৃত্যুদণ্ডই বাধ্যতামূলকভাবে তিন স্তরে যায়: তাজির মামলায় নিম্ন আদালতের তিন বিচারকের বেঞ্চ, তারপর আপিল আদালতের পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ, তারপর সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ; কোনো পক্ষ আপিল না করলেও। সৌদি বিচার বিভাগ আইন, অনুচ্ছেদ ১০, ১৫, ২০; ফৌজদারি কার্যবিধি, অনুচ্ছেদ ১০, ১৯৪, ১৯৯ এর তিন স্তর মিলে ৩ + ৫ + ৫ = ১৩ জন বিচারক সৌদি আইনের মৃত্যুদণ্ডের পুরা প্রক্রিয়া মেনেই বিচার সম্পন্ন করেছে।
কিন্তু ১৩ জন বিচারকের পর্যালোচনার পরও রায়, অভিযোগের বিবরণ বা সাক্ষ্যপ্রমাণ বাংলাদেশ বা পরিবারকে দেওয়া হয়নি। প্রাণহানি ঘটেনি এমন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাজির হিসেবে, অর্থাৎ বিচারকের বিবেচনায়। সৌদি আরব আরব মানবাধিকার সনদ অনুমোদন করেছে, যার অনুচ্ছেদ ৬ বলে মৃত্যুদণ্ড শুধু "সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে"। জেদ্দা মিশন নিজেই বলছে, সাইবার বা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের আগে কোনো নজির নেই; নৈতিকতা-সংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত ১৪৭ বাংলাদেশির সাজা এক মাস থেকে ১৫ বছর।
সৌদি বন্দিতালিকায় সুইটির অপরাধ "ব্যভিচার", নজরুলের "ICT"/সাইবার অপরাধ। (ডেইলি স্টার, প্রথম আলো) জেদ্দা মিশনের এক অনামা কর্মকর্তা বলছেন, দুজনেরই দণ্ড "ব্যভিচার"-এর অভিযোগে।
"চুমুর জন্য মৃত্যুদণ্ড" বা "দুজন স্বামী-স্ত্রী", এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য সমর্থন নেই।বাবা বলেছেন, "নজরুল অবিবাহিত ছিল" ; ওই নারী তাঁর স্ত্রী ছিলেন না, "আমরা তাঁকে চিনিও না"। পরিবারের আরেক সদস্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নজরুল জেল থেকে জানিয়েছিলেন ওই নারীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে (মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে ৩০ সেপ্টেম্বর) জেদ্দা কনস্যুলেটের অনুরোধে সৌদি আরব প্রায় ২,৫০০ নামের একটি বন্দিতালিকা পাঠায়। তাতে দুজনের নাম ও অভিযোগ ছিল, কিন্তু সাজা বা মৃত্যুদণ্ডের কথা ছিল না। কেন ছিল না, ১৯ অক্টোবরের বৈঠকে সৌদি কর্মকর্তা তার "সদুত্তর দিতে পারেননি"।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের নাম তালিকায় রেখে দণ্ডটি বাদ দেওয়া, এটি সৌদি আরবের গুরুতর অস্বচ্ছতা। কিন্তু বাংলাদেশও তালিকাটি যাচাই করেনি। "ব্যভিচার"-এর মতো অভিযোগ দেখেও কেউ খোঁজ নিয়েছেন, এমন খবর নেই। এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিটি মামলার খোঁজ রাখা "মানবিকভাবে অসম্ভব"। এটা আসলে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা, খামখেয়ালি পূর্ণ কাজের মানসিকতা। এই তালিকা পাওয়ার দুই সপ্তাহ পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
ওদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ এমবাসই বা কনস্যুলেটকে আর পরিবারদূতকে আগাম খবর দেয়নি। পরেও সরাসরি জানায়নি; বাংলাদেশ জেনেছে সৌদি বার্তা সংস্থা SPA-র ঘোষণা ও গণমাধ্যম থেকে। কনস্যুলেট বলছে, বিচার বা মৃত্যুদণ্ড নিয়ে "কোনো মাধ্যমেই" জানানো হয়নি। ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩৭ বিদেশির মৃত্যুর খবর কনস্যুলেটকে অবিলম্বে জানাতে বলে। যদিও আগাম নোটিশ এই কনভেনশন অনুযায়ী স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নয়।
নজরুলের পরিবার বলছে, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে খবর দেন; ফোনটি সরকারি ছিল বলে জানা যায়নি।
এরপর ঢাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ১৫ ও ১৬ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট ও রিয়াদ দূতাবাস সৌদি আরবের কাছে বিস্তারিত চায়। ১৭ অক্টোবর, তিন দিন পর, প্রথম মন্ত্রী-পর্যায়ের বক্তব্য আসে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, "আগে কিছু জানানো হয়নি"; ঘটনাটি "বড় শিক্ষা"। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠক হয়েছে। সরকার বলছে, এটি তলব নয়, এবং সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না।
১৯ অক্টোবর প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ঘটনাটিকে "খুবই হতাশাজনক" ও "অত্যন্ত দুঃখজনক-অগ্রহণযোগ্য" বলেন, প্রক্রিয়ায় "ফাঁক" আছে বলে স্বীকার করেন। একই দিনে, পাঁচ দিন পর, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর প্রথম বক্তব্য আসে। জেদ্দায় কনসাল জেনারেল সৌদি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিতীয় কূটনৈতিক পত্র দেন।
২০ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। শীর্ষ পর্যায়ের এই নীরবতা ব্যাখ্যাহীন।
পরিবারগুলোর যখন স্পষ্ট তথ্য সবচেয়ে বেশি দরকার, তখন মন্ত্রীরা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। কোনো বক্তব্যই এখনও প্রত্যাহার হয়নি। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী যখন একজন ওমরাহ ভিসায় গিয়েছিলেন বলছেন তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও বিএমইটির তথ্য দুজনকেই কর্মী বলছে। এক মন্ত্রী যখন বলছেন একজন বগুড়ার, অন্যজন কুমিল্লার। পরিবার ও জেলা প্রশাসক বলছেন একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও বিএমইটির তথ্য বলছে টাঙ্গাইল। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যখন বলছেন নাম তালিকায় আছে কি না "দেখছি"। মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তারা বলছেন, নাম ছিল। সব ইনকম্পিটেন্ট আর আনপ্রফেশনাল লোকদের দিয়ে সরকার চলছে।
এই পোস্ট দেয়া পর্যন্ত মরদেহ দেশে আসেনি; কোথায় আছে, সরকার জানায়নি। সৌদি আরব ছয় দিনেও কোনো লিখিত জবাব বা রায়ের কপি দেয়নি, মরদেহও ফেরত দেয়নি।
নজরুলের পরিবার ন্যায়বিচার আর রাষ্ট্রীয় খরচে মরদেহ ফেরত চায়।
আশা করছি বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের কাছে রায় ও অভিযোগপত্রের কপি ইতিমধ্যে লিখিতভাবে চেয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তরা আইনজীবী ও কনস্যুলার অধিকারের কথা জেনেছিল কিনা তা কনফার্ম করা প্রয়োজন; সেপ্টেম্বরের বন্দিদের নামের তালিকায় কেন তাদের দণ্ড বাদ ছিল তা লিখিতভাবে জানতে চাইতে হবে, কেবল সাক্ষাৎকারে মৌখিক উত্তর নয়। আর অবিলম্বে যেন মরদেহ হস্তান্তর করে সেই দাবিও তুলতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের দাবি দুজনের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করুন এবং সুইটির পরিবারকে খুঁজে বের করুন; রাষ্ট্রীয় খরচে মরদেহ আনুন ও প্রাপ্য অনুদান দিন; পরিচয়, তালিকা, সৌদি জবাব ও মরদেহ নিয়ে একটি একক, তারিখযুক্ত সরকারি তথ্যপত্র প্রকাশ করুন; পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে জবাব দিন; তিন সরকারের আমল ধরে একটি স্বাধীন তদন্ত করুন; সেপ্টেম্বরের তালিকার প্রতিটি বন্দির নাম, বিশেষ করে গুরুতর অভিযোগের মামলাগুলো, এখনই যাচাই করুন; সশরীরে আইনজীবী সাথে নিয়ে তাদের প্রত্যেকের সাথে দেখা করুন। আর সৌদি আরবের সঙ্গে আটক ও দণ্ডের খবর জানানোর একটি লিখিত ব্যবস্থা করুন।
দুটি পরিবার এখনও জানে না, তাদের সন্তানেরা ঠিক কী অপরাধে মারা গেলেন, বা কবে তাঁরা বাড়ি ফিরবেন। দুই রাষ্ট্রের কাছেই এর জবাব তাদের পরিবারের, সকল প্রবাসী পরিবারগুলোর আর সারা জাতির পাওনা।
নোট: ৭১ টা তথ্যসূত্র যাচাই করে এই লেখাটি লেখা হয়েছে যার মধ্যে আছে বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্র, সৌদি সংবাদপত্র আর বিদেশি সংবাদপত্র।