জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসেন খুনের এক বছরেও কান্না থামছে না মায়ের। নীরবে অশ্রু ঝরে বাবার।
রোজ রোজ এমন দৃশ্যের সাক্ষী হলেও সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাই হত্যার বিচারটা হলেও তাদের সান্ত্বনা দিতে পারতাম যে বিচার হয়েছে। তাও তো হয়নি।”
পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ছাত্রীকে পড়াতে গিয়ে গত বছরের ১৯ অক্টোবর খুন হন জোবায়েদ। সেদিন বিকাল সাড়ে ৪টায় ওই ছাত্রীর বাসার নিচতলায় জোবায়েদকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
দুই দিন পর জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বংশাল থানায় মামলা করেন। মামলার আট মাস পর গত ৩০ জুন তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার এসআই আশরাফ হোসেন।
তারা হলেন—জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, তার ‘প্রেমিক’ মাহির রহমান ও মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ১২ অগাস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলির আদেশ দেন।
ঢাকার বিংশতিতম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মাজহারুল ইসলামের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। গত ১১ অক্টোবর মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন ছিল।
তবে তা পিছিয়ে আগামী ২৮ অক্টোবর দিন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী মাজেদুল ইসলাম। মামলার তিন আসামি কারাগারে রয়েছেন। ১১ অক্টোবর তাদের জামিন আবেদন করা হলে আদালত তা নাকচ করে দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জাকির হোসেন খান বলেন, “গত সপ্তাহে মামলাটা ট্রায়ালের জন্য আমাদের আদালতে এসেছে। ১১ অক্টোবর প্রথম দিন ধার্য ছিল। আসামিদের জামিন আবেদন করা হয়।
“আমরা জামিনের বিরোধিতা করি। জামিন নামঞ্জুর হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন রাখা হয়েছে। আশা করছি, ওইদিন অভিযোগ গঠন হয়ে যাবে। এরপর সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করব।”
বছর পার হলেও জোবায়েদ হত্যা মামলার বিচার শুরু না হওয়ায় কিছুটা হতাশ বাদী এনায়েত হোসেন সৈকত।
তিনি বলেন, “মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। বাকি কাজগুলো তেমন দ্রুত আগায়নি। এক বছর তো হয়ে গেল।
“ভাই হত্যার বিচার শুরু হলো না। বাবা-মা জানতে চায়, বিচার শুরু হবে কবে? রায় হবে কবে? কোনো জবাব দিতে পারি না।”
ঊনপঞ্চাশতম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সদ্য নিয়োগ পাওয়া সৈকত বলেন, “আমরা চার ভাই। আমি বড়, আমার আড়াই বছরের ছোট ছিল জোবায়েদ। বাবা অনেক স্ট্রাগল করে আমাদের বড় করেছেন। তাদের আশা ছিল, আমরা বিসিএস ক্যাডার বা সরকারি উচ্চ পদস্থ পদে চাকরি করব। লোকজন আমাদের চিনবে।
“আমাদের দিয়ে বাবা-মা কোনো কষ্টের কাজ করাতেন না। টেবিলে সময় দিতে বলতেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকাকাল জোবায়েদকেও আমার কাছে রেখেছিলাম। ওকে দিক-নির্দেশনা দিতাম। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সে আমার সাথেই ছিল। পরে আমি হল ছেড়ে দেই। আর ও মেসে ওঠে। এরপর তো জোবায়েদের সাথে এ ঘটনা ঘটল।”
এনায়েত হোসেন সৈকত বলেন, “প্রতিদিন মা কান্নাকাটি করেন। বাবার চোখেও পানি দেখি। কিন্তু তাদের দিতে পারিনি। কারণ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। তাদের সাথে থাকলে তারা একটু ভালো থাকেন। আমার ভেতর জোবায়েদকে খুঁজে পান। কারণ আমরা একসাথে চলাফেরা করেছি।
“উনাদের কাছ থেকে চলে আসলে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ভাইটা খুন হয়েছে, যদি বিচারটা হতো— তাও তাদের সান্ত্বনা দিতে পারতাম, যে বিচার হয়েছে। সেটাও হয়নি। আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চাই এবং সেটা যেন দ্রুততার সাথেই করা হয়।”
জোবায়েদ হত্যা মামলায় বর্ষা অন্যায়ের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তার আইনজীবী নূর মাহাবুবুল আলম।
তিনি বলেন, “আগামী তারিখে আসামির অব্যাহতির শুনানি করব। তারপর যদি অভিযোগ গঠন হয়ে যায়, তাহলে তো ট্রায়াল ফেইস করতে হবে। আল্লাহ চান তো, ন্যায়বিচার পাব।
“যদিও বর্ষার বিরুদ্ধে সেরকম সাক্ষ্য প্রমাণ আসেনি। আর থাকলে তো আসবে। মেয়েটা ভিকটিমাইজড।”
আইনজীবী নূর মাহাবুবুল আলম বলেন, “যে বাসায় খুনের ঘটনা ঘটে, ওই বাসাটা বর্ষাদের। মাহির তাদের বাসার ভাড়াটিয়া। মাহির বর্ষাকে ভালোবাসতো। তার প্রতি মাহিরের ফ্যাসিনেশন ছিল।
“বর্ষা তা জানতো না। যদিও জোর করে স্বীকারোক্তিতে বলানো হয়েছে, বর্ষার সাথে মাহিরের সম্পর্ক ছিল। আমরা জানি, তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
এ আইনজীবী বলেন, “আমি পার্সোনালি বর্ষার সাথে কথা বলেছি। সে বলেছে, ছেলেটার সাথে তার সম্পর্ক ছিল না। বর্ষাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমরা সবাই ন্যায়বিচার চাই। যে দোষী তার সাজা হোক। বর্ষারও ন্যূনতম দোষ থাকলে, ততটুকু সাজা পাবে। তবে সে অলরেডি পেয়ে গেছে সেই সাজা।”
তবে বর্ষার সঙ্গে মাহিরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল দাবি করে মাহিরের আইনজীবী এম রাশেদুজ্জামান বলেন, “বর্ষার সাথে মাহিরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এরপর ওই ছেলেটা (জোবায়েদ) প্রাইভেট পড়াতে আসে।
“তার সাথেও বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে। ওই ছেলেটা বর্ষার কিছু ভিডিও করে। সেগুলো সোশাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। মেয়েটা বাঁচতে চায়।”
তিনি বলেন, “মাহিরের সাথে বর্ষা যোগাযোগ করে। তাকে দিয়ে ওই ছেলেটাকে ভিডিও ছাড়তে নিষেধ করতে বলে। মাহির ছেলেটাকে নিষেধ করে ভিডিও ছাড়তে। ছেলেটা রাজনীতি করত। প্রভাব খাটায় এবং মাহিরকে চ্যালেঞ্জ করে। বর্ষা মাহিরের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করে।
“সে ছুরি নিয়ে ছেলেটাকে ভয় দেখাতে চায়। মারার কোনো ইনটেনশন ছিল না। ভয় দেখাতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে গেছে। বর্ষার সাথে মাহিরের প্রথমে প্রেম ছিল। বর্ষা মাহিরকে ইউজ করেছে। আরেকটা ছেলে ছিল (ফারদীন)। সে মাহিরের সাথে গিয়ে ফেঁসে গেছে। যাই হোক, আমার আসামির জন্য আইনিভাবে লড়াই করব।”
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জোবায়েদ হোসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করাতেন। প্রতিদিনের মতো গত বছরের ১৯ অক্টোবর বিকালে তিনি বংশালের নুর বক্স লেনের রৌশান ভিলায় বর্ষাকে পড়ানোর জন্য যান। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ওই ছাত্রী জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে বলেন, ‘কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে’।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামরুল হাসান সন্ধ্যা ৭টার দিকে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন সৈকতকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এ তথ্য দেন। সৈকত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলে ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় সিঁড়ি ও দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের তৃতীয় তলার সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় দেখতে পান তারা।
