Image description

সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তাদের মরদেহ দেশে আসার একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল। পাশাপাশি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তি ‘স্বামী-স্ত্রী ছিলেন’ এবং ‘তারা হানিমুনের পরিবর্তে ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন’ বলেও একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে এসব দাবির সত্যতা পায়নি কালবেলা।

শুরুতে প্রচারিত ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধান করে কালবেলা। অনুসন্ধানে ‘আহমেদ দিদার’ নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ১৭ অক্টোবর দুপুর ১টা ২৪ মিনিটে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেখানে থাকা ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল রয়েছে।

 

পরেরদিন (১৮ অক্টোবর) একই ভিডিও আবারও পোস্ট করেন দিদার। পোস্টগুলোয় তিনি নিজেই দাবি করেন, কফিনগুলো সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড; মরদেহ দেশে আসা কিংবা হানিমুনে যাওয়ার দাবিগুলো গুজব

 

পরবর্তীতে আজ (১৯ অক্টোবর) বেলা ১১টা ১৭ মিনিটে একটি এবং ১১টা ৩৫ মিনিটে একটি পোস্টের ক্যাপশন পরিবর্তন করেন আহমেদ দিদার।

 

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড; মরদেহ দেশে আসা কিংবা হানিমুনে যাওয়ার দাবিগুলো গুজব

 

এছাড়া, ১১টা ৩৪ মিনিটে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এই ভিডিওগুলোর ক্যাপশন ভুল ছিল’।

বিষয়টি সম্পর্কে আরও জানতে আহমেদ দিদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কালবেলা। তিনি বলেন, ‘ভিডিওটি গত ১৭ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার সময় আমি ধারণ করেছিলাম। তবে, এগুলো সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির নয়। আমি ভুল জেনে পোস্ট করেছিলাম। এখন পোস্ট এডিট করেছি।’

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির মরদেহ বাংলাদেশে এসেছে কি না জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘ভিডিওটি দেখেছি। এখন পর্যন্ত ওই দুই ব্যক্তির মরদেহ দেশে আসেনি। দাবিটি গুজব।’

এরপর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলাম এবং সুইটি আক্তার ‘স্বামী-স্ত্রী ছিলেন’ এবং তারা ‘হানিমুনের পরিবর্তে ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন’ এই দাবিগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান করে কালবেলা।

অনুসন্ধানে গতকাল (১৮ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব সরকার। নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তিনি সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। এসব তথ্য জানা গেছে তার স্বজনদের কাছ থেকে।

বিষয়টি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য নজরুল ইসলামের বাবা আবদুল বাছিরে সঙ্গে যোগাযোগ করে কালবেলা। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার একমাস পর মক্কার হেরাম শরীফে সে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পায়। তবে, ৭/৮ মাস পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় দেড়মাস পর নজরুল সেদেশের জেল থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায় সে সেখানে কারাবন্দি। তবে, কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে সে এই বিষয়ে কিছু জানায়নি কিংবা আমরাও জানি না। প্রায় তিন বছর তিনমাস ধরে সে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দেয়। সে জানায় সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। গত বুধবার শুনলাম নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারছি না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নজরুল অবিবাহিত ছিল। মেয়েটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।’

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন কালবেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ দাস।

কালবেলা