Image description

স্থবির অর্থনীতি চাঙা করতে গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ তহবিল গঠন করা হয়। তবে এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণে গতি নেই। এখন পর্যন্ত বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকগুলো যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। এসব ঋণের বড় অংশ ফেরত না আসায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ কারণে এখন ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণ পেলে প্রতিষ্ঠানটি আবার চালু করা সম্ভব হবে কি না এবং ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে। এসব কারণে ঋণ বিতরণে দেরি হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে চালু কারখানাগুলো পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম। বন্ধ কারখানা চালু করার উদ্যোগও পিছিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের অনেকে ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে আবেদন করতে পারছেন না।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিতে ব্যবসায়ীরা আগ্রহী। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে অনেকে আবেদন করতে পারছেন না। অনেক ব্যাংক আবেদন নিতে চাইছে না। আবার কোনো কোনো ব্যাংক নানা অজুহাতে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। এসব জটিলতা দ্রুত দূর করে জমা পড়া আবেদনগুলো নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে দ্রুত ঋণ বিতরণ করা গেলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি বাজারে পণ্যের চাহিদাও কম। এ কারণে বন্ধ কারখানা চালু করা বা নতুন ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, সম্ভাব্য আয় ও নগদ অর্থের প্রবাহ যাচাই করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও ভালোভাবে পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া ঋণগ্রহীতা অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত নন, তা নিশ্চিত করতে লিখিত অঙ্গীকারনামা নিতে হচ্ছে। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে ঋণ অনুমোদন দিতে এখন তিন থেকে চার মাস সময় লাগছে।

কোন খাতে কত ঋণ বিতরণ

গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণের কথা। এসব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫টি প্যাকেজের আওতায় গ্রাহক পর্যায় থেকে ১৪ হাজার ৫২০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। বাকি ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ১৫টি প্যাকেজের মধ্যে ছয়টি খাতে এখনো কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি।

তথ্য অনুযায়ী, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির বিশেষ স্কিমে বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ৯০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত চালুর সহায়ক প্রাক্‌-অর্থায়ন স্কিম থেকে বিতরণ হয়েছে ৫৬১ কোটি টাকা। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য গঠিত স্কিমে ৫০০ কোটি টাকা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ২৯৩ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গঠিত স্কিমে ২০০ কোটি টাকা, উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গঠনের স্কিমে ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং স্টার্টআপ খাতে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্কিমে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রিন ফ্যাক্টরি ভবন ও পরিবেশবান্ধব শিল্পের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিমুখী খাতের স্কিমে ৯৮ কোটি টাকার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোতে আবেদন জমা পড়ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ পাওয়ার যোগ্য, ব্যাংকগুলো তাদের আবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি করছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুবই আন্তরিক।

দেশিপোশাক বাছুন

 

ঋণ বিতরণে গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ

প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সম্প্রতি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঋণ বিতরণ সহজ করতে ব্যবসায়ীরা কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকাররা ঋণ বিতরণের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা দ্রুত আয়োজন, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া বন্ধ এবং বন্ধ কারখানায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খেলাপি হওয়াকে একমাত্র অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করা। তারা প্রকল্পের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তিকে ঋণ পাওয়ার পূর্বশর্ত করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকাররা বলেছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ঋণ দিতে হবে। ঋণ পেলে যেসব প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তবে ঋণ ফেরত আসবে না—এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করা উচিত নয়। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে ঋণ অনুমোদন করতে হবে।