Image description

পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজির ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় দেড় বছরে ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু এর বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ওই সময়কার মোট জরিমানার মাত্র ০.৩৫ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বাকি ৯৯.৬৫ শতাংশ অর্থ এখনো আদায় হয়নি। বিপুল অঙ্কের জরিমানা করেও তা আদায় করতে না পারায় বিএসইসির শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বিএসইসির কার্যক্রম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেয়ার কারসাজির ঘটনায় এসব জরিমানা করা হয়। এরপর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আরও ৬৫টি শাস্তিমূলক আদেশ জারি করেছে কমিশন। এসব আদেশে জরিমানা করা হয়েছে ১১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, কারসাজির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের হিসাব থেকে ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জরিমানার আদেশ জারির পর অর্থ আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ায় আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

কারসাজির বিভিন্ন ঘটনায় বড় অঙ্কের জরিমানা করেছে বিএসইসি। বেক্সিমকো শেয়ারের লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবুল খায়ের, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে জরিমানার অঙ্ক ১৯৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন বীমা কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের বিরুদ্ধে মোট ৩৫১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শেয়ার কারসাজির বাইরেও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন ও অন্যান্য অনিয়মের ঘটনায়ও জরিমানা করেছে কমিশন।

এর মধ্যে লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘটনায় ২৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা জরিমানার তথ্য রয়েছে।

জরিমানা আদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের বক্তব্যেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আগের কমিশন প্রায় দুই বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল। আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালবেলাকে বলেন, ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানার বিপরীতে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা আদায়ের তথ্য নিয়ে কিছুটা ভুলবোঝাবুঝি রয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ আদায় হয়েছে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ে আরোপ করা জরিমানা থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আদায় মাত্র ৩৩ লাখ টাকা।

গত ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগের সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্নীতির ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজির প্রমাণ পেলে জরিমানার আদেশ দেয়। তবে দেশের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই শাস্তি কার্যকর করা এবং জরিমানার অর্থ আদায় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা বিএসইসি যখনই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করে, তখনই অভিযুক্তরা আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নেয়। তারা উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করে জরিমানার ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। এই স্থগিতাদেশের পর আইনি লড়াই বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। ফলে অপরাধীদের শাস্তি কার্যকরের বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে।

এ ছাড়া বিএসইসির আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিমানা আরোপ করা হলে তারা সঙ্গে সঙ্গেই তা পরিশোধ করতে বাধ্য নয়। অভিযুক্তরা এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান। এতেও অনেক সময় চলে যায়।

ওই একই অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান আরও বলেন, জরিমানার আদেশের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাইছে। এতে অর্থ আদায় বিলম্বিত হচ্ছে। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন এবং ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে অনাদায়ী জরিমানার কত অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ বা বিচারাধীন মামলার কারণে আটকে আছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে কত টাকা আদায়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং কত টাকা আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, সেই তথ্যও আলাদাভাবে জানা যায়নি।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিএসইসির জারি করা ৬৫টি শাস্তিমূলক আদেশে জরিমানা করা হয়েছে ১১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য জরিমানার মধ্যে রয়েছে ফরচুন সুজের ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা, খান ব্রাদার্সের ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আফতাব অটোমোবাইলসের ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের ৭৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে বিএসইসির এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় কমিশন এখন বেশি তৎপর। পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যেসব জরিমানা করা হচ্ছে, সেগুলো আদায়ের বিষয়েও কমিশনের তৎপরতা রয়েছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারসাজি ও অনিয়ম প্রতিরোধে জরিমানা আরোপের পাশাপাশি তা আদায় নিশ্চিত করাও জরুরি। জরিমানার আদেশ, আদায়, অনাদায়ী অর্থ এবং আদালতে বিচারাধীন মামলার হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে। অন্যথায় বড় অঙ্কের জরিমানা সত্ত্বেও তা আদায় না হওয়ার প্রবণতা বাজারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন জিইয়ে রাখবে।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমদ কালবেলাকে বলেন, শেয়ার কারসাজির ঘটনায় জরিমানা করে বিএসইসি তার দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু যারা কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তারা আইন ও আদালতের সুযোগ নিয়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করছেন। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির দায় নেই। সংস্থাটির কাজ জরিমানা করা; জরিমানার অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা থাকলে তা ভিন্ন বিষয়।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান কালবেলাকে বলেন, সার্টিফিকেট কেসের মাধ্যমে জরিমানার টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া বেশ ধীর। অনেক ক্ষেত্রে মামলা করার পাঁচ বছর পরও আদায় কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য ও ঠিকানা হালনাগাদ থাকে না। অনেক সময় ঠিকানাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব কারণে জরিমানার টাকা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।