Image description

পড়াশোনার সবচেয়ে কঠিন কাজ এখন আর কঠিন নয়! শিক্ষাজীবনের সম্মানজনক সবচেয়ে ‘বড় ডিগ্রি’ হিসেবে পরিচিত এমফিল-পিএইচডি পেতে এখন কষ্ট অনেক কম! যে কেউ চাইলেই এমন ‘কঠিন’ ডিগ্রি খুব ‘সহজে’ বাগিয়ে নিতে পারছেন। শুধু দরকার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

রাজধানীতে স্টাডি সেন্টারের আড়ালে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ইউজিসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রীতিমতো ‘পিএইচডি ডিগ্রি’ বিক্রি করছে। নেওয়া হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন। সবার নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে চলছে এ অপকর্ম। তবে আশার খবর হলো, বর্তমান সরকার স্টাডি সেন্টারের লাগাম টানার উদ্যোগ নিয়েছে।
 
যুগোপযোগী করা হচ্ছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার বিধিমালা। এরপর অবৈধ স্টাডি সেন্টার আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ইউজিসি।

সূত্র জানায়, ব্যাচেলর, মাস্টার্স, এমবিএ, এলএলবি, এমফিল এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।

অথচ দেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো স্টাডি সেন্টারকে অনুমোদন দেয়নি ইউজিসি। শুধু একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও ১৭টি প্রতিষ্ঠান ও স্টাডি সেন্টারের একটি তালিকা রয়েছে ইউজিসির কাছে। অননুমোদিত এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তালিকায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে নানা ধরনের ডিগ্রি ও কোর্সের কার্যক্রম চলছে।

এর মধ্যে আইন, ব্যবসায় প্রশাসন, তথ্য-প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ফ্যাশন, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের কোর্স রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এমফিল, পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল পর্যায়ের ডিগ্রির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের কার্যক্রমের বিস্তার ঘটায় শিক্ষার্থীদের প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডিগ্রির স্বীকৃতি, শিক্ষার মান, ভর্তি-প্রক্রিয়া, পাঠদান এবং সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ দেশে এসব ডিগ্রির সমতা বিধানের সুযোগ নেই।

ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনুমোদনহীন এসব স্টাডি সেন্টার এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার অনুমোদনের জন্য ২০১৪ সালে একটি বিধিমালা জারি করা হয়। সেই বিধিমালাটি যুগোপযোগী নয়। আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে একটি বিধিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছি।’

যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানের নাম বেশি : ইউজিসির কাছে থাকা তালিকায় বাংলাদেশে পরিচালিত স্টাডি সেন্টার বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ অন্যতম। যাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকলেও ইউজিসির অনুমোদন নেই। অথচ কোর্স কারিকুলাম, শিক্ষাপদ্ধতিসহ সব ধরনের কার্যক্রম দেখভাল করে ইউজিসি। তারা ইউজিসির কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনকি ইউজিসির ওয়েবসাইটে তাদের নাম নেই।

অনুমোদন ছাড়া অন্যান্য স্টাডি সেন্টারগুলো হচ্ছে ভূঁইয়া একাডেমি, ব্যাক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, নিউক্যাসল ল একাডেমি, নিউক্যাসল ল একাডেমি ওয়েস্ট, কেমব্রিজ বিজনেস অ্যান্ড ল একাডেমি, ব্রিটিশ স্কুল অব ল, লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (সাউথ), লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (নর্থ), লিংকনস হায়ার এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট, লন্ডন স্কুল অব কমার্স ঢাকা, এডুক্যান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কিংস্টন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, স্পিরিচুয়াল ইনস্টিটিউট অব নিউইয়র্ক এবং ঢাকা সেন্টার ফর ল অ্যান্ড ইকোনমিকস। তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানই বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ার, ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার, লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডার্বি, লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড ব্রিস্টল, নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস, রেক্সহ্যাম গ্লিন্ডউর ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ার, বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্লুচেস্টারশায়ার।

এ ছাড়া তালিকায় সুইজারল্যান্ডের এসএমসি ইউনিভার্সিটি এবং মালয়েশিয়ার পুত্রা বিজনেস স্কুলের নামও রয়েছে। তবে তালিকায় কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা মানেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই ডিগ্রি দেওয়া হয় কি না তা জানা যায়নি।

এলএলবি থেকে পিএইচডি—নানা কোর্স : স্টাডি সেন্টারগুলোর উল্লেখ করা কোর্সগুলোর মধ্যে রয়েছে এলএলবি, এলএলএম, বিবিএ, এমবিএ, বিএ, কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি, আইন বিষয়ে ডিপ্লোমা, তথ্য-প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, ফ্যাশন, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, এমফিল ও পিএইচডি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ডক্টরাল ও পোস্টডক্টরাল পর্যায়ের ডিগ্রির কথাও রয়েছে।

তালিকায় ভূঁইয়া একাডেমির সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নাম উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কোর্সের মধ্যে এলএলবি, বিবিএ ও আইন বিষয়ে ডিপ্লোমার কথা বলা হয়েছে। নিউক্যাসল ল একাডেমির তালিকায় এলএলবি, এলএলএম ও বার ট্রান্সফার টেস্টের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে লন্ডন স্কুল অব কমার্স, ঢাকার তালিকায় বিবিএ, এমবিএ, ডিপ্লোমা, এমফিল ও পিএইচডির কথা বলা হয়েছে।

লিংকনস হায়ার এডুকেশন ম্যানেজমেন্টের তালিকায় এমফিল, পিএইচডি, বিবিএ, এমবিএ ও ডিপ্লোমা রয়েছে। কিংস্টন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির তালিকায়ও পিএইচডি, এমবিএ, বিবিএ ও ডিপ্লোমার উল্লেখ রয়েছে।

ইউজিসির ২০১৪ সালের বিধিমালা কী বলছে : ২০১৪ সালে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টারের জন্য বিধিমালা জারি করা হয়। তাদের উভয়ের জন্য পৃথক শর্ত ঠিক করা হয়। বিধিমালায় বলা হয়, ইউজিসির কাছ থেকে সাময়িক অনুমতিপত্র বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সনদ না নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারবে না।

অনুমোদনের জন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি ও স্বীকৃতির তথ্য; স্থানীয় উদ্যোক্তা বা প্রতিনিধির পরিচয় এবং সাংগঠনিক কাঠামো; প্রস্তাবিত কোর্স, বিস্তারিত পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি; শিক্ষকদের তালিকা, যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত; ভবনের মালিকানা বা ভাড়ার দলিল; বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রতিনিধির মধ্যে চুক্তি; বিনিয়োগের পরিমাণ ও অর্থের উৎস দাখিল করতে হবে। ইউজিসি আবেদন যাচাই করে প্রাথমিক অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। প্রাথমিক অনুমোদনের পর সরকারকে সুপারিশ পাঠানোর বিধানও রয়েছে।

অবকাঠামো ও শিক্ষকের শর্তে বলা হয়েছে, স্টাডি সেন্টারের আয়তন কমপক্ষে ১০ হাজার বর্গফুট, প্রতিটি বিভাগ বা কোর্সের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক, লাইব্রেরি  কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ বর্গফুট ও অন্তত দুই হাজার বই, সংরক্ষিত তহবিল এক কোটি টাকা জমা রাখতে হবে।

তবে ইউজিসি বলছে, এক যুগ আগে এই বিধিমালা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নেই। ফলে এই বিধিমালাটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন ১০ হাজার বর্গফুট জায়গায় একটা ছোট স্কুল চালানো কষ্টকর, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলবে।

অনুমোদনহীন স্টাডি সেন্টার বন্ধের নির্দেশ, তার পরও চলছে : চলতি বছরের ৩০ মার্চ অনুমোদনহীন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দেয় ইউজিসি। একই সঙ্গে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন ব্যতীত পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য আবেদন করতেও বলা হয়। যদিও সে সময় মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। যারা দাবি করে, তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর সুযোগ নেই। তারা ইউজিসির কোনো অনুমোদন দেখাতে পারেনি। 

সে সময় ইউজিসি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলে, ‘বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস এবং স্টাডি সেন্টার বা টিউটরিয়াল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। অনুমোদন ব্যতীত স্থাপিত ও পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা ইতিমধ্যে কমিশনের হস্তগত হয়েছে। ওই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাসহ সব কার্যক্রম স্থগিত করা হলো। অন্যথায় অননুমোদিতভাবে পরিচালিত ওই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

যদিও অনুমোদনহীন ওই সব স্টাডি সেন্টারের বিরুদ্ধে সরকার এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তারা আগের মতোই ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।