Image description

দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে নানা চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিশ্রুতিও পাচ্ছেন। কিন্তু একটি দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম শর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৮ মাসে ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ এলেও ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ আসছে না। একের পর এক ভয়ঙ্কর পৈশাচিক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন অবনতি ঘটেছে যে, গত ৯ মাসে ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মামলা না হওয়ার ‘অপরাধ’ ঘটনার সংখ্যা এর চেয়েও আরো বেশি। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দফতর ও মাঠ প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই দেশে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কথা স্বীকার করে ১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও পুরোপুরি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বিগত শাসনামলে পুলিশের ব্যবহার এবং তা নিয়ে জনঅসন্তোষ বাহিনীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সম্মেলনে ৫২টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোকে তারা বিনিয়োগ করবেন। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নানাভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা অবনতিজনিত কারণে বিদেশিরা বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় দোকানে ঢুকে জামায়াতকর্মী নিজামকে গুলির ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজাম পেশায় মুদিদোকানি। রোববার রাত ১০টার দিকে উপজেলার ১ নম্বর আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নের জিনু মার্কেটে দোকানে ঢুকে তাকে গুলি করা হয়। তিনি ঢাকা মেডিক্যলি কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সীতাকু-ের বাড়বকু- ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড় সংলগ্ন পাকা রাস্তায় যুবদলকর্মী বাপ্পিকে মোটরসাইকেল থেকে টেনে নামিয়ে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি খুলনায় সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা পুলিশ পরিদর্শকের দুই হাতের কব্জিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। শুক্রবার সালিসে যাওয়ার পথে কুমিল্লায় যুবদল নেতা আবু কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এর আগের বৃহস্পতিবার রাতে নিজ বাড়ির মাত্র ৫০ গজ দূরে চায়ের দোকানে ঢুকে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে পূর্বঘোষণা দিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শুধু হত্যাকা- নয়, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ এমনকি রাস্তা দখল করে বিক্ষোভকালে রাজপথে পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে কারখানার কর্মীরা। দেশে যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আসার সুয়োগ হয়েছে তখনই অপরাধের সামগ্রিক চিত্রে অস্বস্তি ও উদ্বেগ-দুই প্রবণতাই স্পষ্ট। দ্রুত দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করা অতিজরুরি বলে মনে করেন অপরাধ ও সামাজিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আইনের শাসন, পুলিশের সক্ষমতা ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট এক লাখ ৫১ হাজার ৫৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৭ হাজার ৮০৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৯০টি। বৈঠকে সারা দেশে মাদকের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে গৃহীত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যস্ত সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কিংবা আবাসিক এলাকায় এমনকি নিজ ঘরেও নিরাপদ বোধ করছে না দেশের সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে টার্গেট কিলিং, চুরি, ধর্ষণ, সাইবার ক্রাইম, মারামারি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা যেন প্রতিদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দফতর ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় আইনশৃঙ্খলা অবনতির বড় কারণ। সঠিক মনিটরিং না থাকায় অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে অপরাধীরা। সেই সঙ্গে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক না থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে থানা পুলিশ কিংবা মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয় থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে পেশাদার অপরাধীরা। যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বেড়েই চলছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, হঠাৎ করেই দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নতি হয়নি। পুলিশের মনোবল ভেঙে গেছে, যা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। দেশে প্রতিনিয়ত অপরাধের ঘটনা ঘটছে। অপরাধীরা যখন দেখে অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন নতুন অপরাধ এবং অন্যরাও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত হয়। তিনি আরো বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব। যুবকরা নানানভাবে মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। তাই অপরাধ আর উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী শিক্ষক এ বি এম নাজমুস সাকিব ইনকিলাবকে বলেন, চাঁদাবাজ কিংবা অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক দল বা পরিচয় নেই। তবে তারা শেল্টার নেয়। তাদের একমাত্র টার্গেট টাকা উপার্জন। সমাজ স্বীকৃত পথে আয় না করে তারা বিভিন্ন পথে সহজে টাকা নেয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধীদের পেছনের শক্তিতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় প্রশাসন হস্তক্ষেপে অনীহা প্রকাশ করে। তিনি আরো বলেন, যেকোনো ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তাদের স্বাধীনতা নেই। সংবিধানে যেকোনো সন্দেহজনক ব্যক্তিকে পুলিশ যেকোনো সময় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু পুলিশের ব্যাকআপ নেই। পলিটিক্যাল পেট্রোনাইজ না থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য সবার আগে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। পুলিশ মাঠ পর্যায়ের মিড কিংবা লো-লেভেলের অপরাধী ধরে চালান দেয়। আড়ালে থাকে তাদের গডফাদার চক্র। যারা নিজেদের কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। শুধু মাঠ পর্যায়ের ছিচকে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করলেই হবে না সমূলে আঘাত করতে হবে। এজন্য একমাত্র সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে খুলনা নগরের এক ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরির’ অপবাদ দিয়ে বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজমল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার সাভারের আমিন বাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এসআই আলতাফ হোসেনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর শনির আখড়ায় আসমান খান নামের এক ব্যবসায়ীকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতর ঢুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগের দিন ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় মো. ইসমাইল (৫০) নামে এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট সকালে ‎জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেয়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে মারা যান বগুড়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৫)। গত ৯ আগস্ট ঢাকার উত্তরায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শাহিনুর বেগম (৩৮) ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয়রা পিটুনি দিলে পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ২২ আগস্ট রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, পূজা উদ্যাপন কমিটি, স্থানীয় জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সারা দেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা-অর্চনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়, এজন্য নাগরিকদের সহযোগিতা করতে হবে। পুলিশের কার্যকারিতা জনগণের সহায়তার ওপর নির্ভর করে।