Image description

জাতীয় শিক্ষানীতি ও সরকারি ভর্তি নীতিমালার পরস্পরবিরোধী অনুচ্ছেদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার ত্রিপক্ষীয় জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের শিশুশিক্ষা। সরকারি নীতিমালার অস্পষ্টতা ও বয়সের কড়াকড়ির কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে লাখ লাখ শিশু। এই সুযোগে দেশের শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিকমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি ও প্রতারক চক্র।

নীতির অসঙ্গতি ও বয়সের বিভ্রান্তি : জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষের ১ জানুয়ারিতে শিশুর বয়স ‘ছয় বছর পূর্ণ (৬+)’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ভর্তির কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিদ্যালয় শুমারিতে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সি শিশুকেও প্রথম শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা পুনরায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ফিরতে পারে।

তবে সংকট ঘনীভূত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারিকৃত ২০২৭ সালের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালায়। এতে এক বাক্যে ‘শিক্ষার্থীর বয়স ৬+ ধরে ভর্তি নিশ্চিত করার’ নির্দেশনা দেওয়া হলেও পরের বাক্যে বলা হয়েছে- সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ৭ বছর। একই নীতিমালায় দুই ধরনের বার্তা থাকায় তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাক-প্রাথমিকের বয়স ৫+ বলা হলেও ভর্তি নীতিমালায় ৫ বছর বয়সি শিশুকে সরাসরি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবার ৭ বছর পার হলেই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভর্তিতে বয়সের বিষয়ে নীতিমালায় এই পরিবর্তন আনা হয়।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর ফাঁদ ও অভিভাবকের ভোগান্তি : জাতীয় শিক্ষানীতির বাইরে গিয়ে নগরীর অধিকাংশ বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও নামিদামি স্কুল প্লে, নার্সারি ও কেজি-এই তিন স্তরে শিশু ভর্তি করায়। প্লে শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে তিন থেকে সাড়ে চার বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের শর্ত দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে প্লে শ্রেণিতে ভর্তির বয়স ৩ বছর ১ মাস থেকে ৪ বছর এবং নেভি অ্যাংকরেজ স্কুলে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ বছর। কোনো শিশু সাড়ে চার বছরে প্লে-তে ভর্তি হলে ধারাবাহিকভাবে নার্সারি ও কেজি শেষ করতে তার বয়স হয় সাড়ে সাত বছর। ফলে একই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ওঠার সুযোগ পেলেও কোনো কারণে স্কুল পরিবর্তন করতে গেলে সরকারি নীতিমালার ৭ বছরের শর্তে আটকে যাচ্ছে শিশুটি।

শাহরিয়ার নওশাদ ও শারমিন শাহরিয়ার দম্পতির মেয়ে অনাবিয়াকে ৪ বছর ১ মাস বয়সে একটি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে কেজিতে পড়ুয়া অনাবিয়া আগামী বছর প্রথম শ্রেণিতে ওঠার সময় বয়স হবে ৭ বছর ১ মাস ১৫ দিন। দেড় মাস বেশি হওয়ায় কোনো ভালো সরকারি বা নামি স্কুলে তার ভর্তির ফর্ম পূরণ করা যাচ্ছে না। নীতিমালা অনুযায়ী তাকে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় বসতে বলা হচ্ছে। অথচ সে প্রথম শ্রেণির পাঠ্যক্রম শেষ করেনি। মা শারমিন শাহরিয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সঠিক তথ্য দিয়ে সন্তানের জন্মনিবন্ধন করে এখন বিপদে পড়েছি। কেজি থেকে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করতে হবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে হবে। প্রথম শ্রেণিতে না পড়া একটা বাচ্চা কীভাবে ভর্তি পরীক্ষায় টিকবে। অসুস্থতা বা করোনাকালীন পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাজীবনে গ্যাপ তৈরি হতেই পারে, তার মানে কি শিশুটির পড়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে?

একই জটিলতায় পড়েছিলেন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। পরে তিনি দুই সন্তানকে স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভর্তি সহায়ক পেজে শত শত অভিভাবক এই বয়সের ফাঁদ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন। রুমাইয়া ফারুকী প্রভা তার কেজিতে পড়া ৭+ ছেলেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে না পেরে ফেসবুকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। জাকিয়া নাজনিন তুলি নামের এক নারী ফেসবুকে লিখেছেন, ভয়াবহ অবস্থা! করোনা-পরবর্তী সময়ে অনেকে ইচ্ছা করেই বাচ্চাকে বিলম্বে স্কুলে দিয়েছে। এতেই গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এই বিষয়টি সরকারের বিবেচনা করা উচিত ছিল। নাদিয়া আক্তার লিখেছেন, সমস্যায় পড়বে আমার মতো মায়েরা যারা বাচ্চার বয়স চুরি করে কমায়নি।

সক্রিয় দালালচক্র ও তথ্যভান্ডারের হুমকি : জন্মনিবন্ধনে সঠিক তথ্য দিয়ে বিপাকে পড়া অভিভাবকদের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। ফেসবুকের বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক গ্রুপে অর্থের বিনিময়ে জন্মসনদে বয়স কমিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের সাফওয়ান ইবনে সাঈদ নামের এক ব্যক্তি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অফিসের লোগো ব্যবহার করে মাত্র দুই দিনে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের নিশ্চয়তা দিয়ে প্রকাশ্যে ফোন নম্বর ও প্রচার চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে এ প্রতিবেদককেও তিনি আশ্বাস দেন। যেখানে আইনি প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র জমা দিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে দালালদের মাধ্যমে ভুয়া টিকা কার্ড বা মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে দ্বিতীয়বার জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হচ্ছে। এতে দেশের জাতীয় তথ্যভান্ডার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। ভুয়া জন্মনিবন্ধনের সত্যতা স্বীকার করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনেকে বিদেশ যাওয়ার সুবিধা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বয়স ও নাম পরিবর্তন করে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করছেন। ধরাও পড়ছে। জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত করতে নতুন সফটওয়্যারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্কুলে ভর্তিতে সরকারি নীতিমালার এই স্ববিরোধী অবস্থান সম্পর্কে জানতে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা-২০২৭-এর স্বাক্ষরকারী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব তানিয়া ফেরদৌসের সঙ্গে গত শুক্রবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের মতে, জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে ভর্তি নীতিমালার বৈষম্যমূলক ও সাংঘর্ষিক শর্তগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনিক ভুলের মাসুল দিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকার ক্ষুণœ হতে থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই ভর্তিতে বয়স নির্ধারিত। এর উপকারিতা আছে। তবে আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অনেক বাচ্চা ঝরে পড়ে। নীতিমালার কারণে একটা শিশুর শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত না। বয়সের কারণে কারও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ভুয়া জন্মনিবন্ধন বাড়বে- এটা সমর্থন করি না। নীতিমালাটি আগের। বর্তমান সরকার আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। সমস্যাটা যেহেতু সামনে এসেছে, আশা করি সরকার এটা পুনর্বিবেচনা করবে।