জুলাই সনদ পাসের এক বছর পরও বাস্তবায়ন নিয়ে একমত হতে পারছে না বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নতুন সংসদের প্রথম দিন থেকেই দুই মেরুতে হাঁটছে দুপক্ষ।
সংবিধান সংস্কারে পরিষদ গঠন করতে চায় বিরোধী দল। তবে, এর বদলে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার। যাকে প্রতারণা বলছে জামায়াত-এনসিপি।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, ‘আমরা কিছুই পাইনি; বরং আমাদের মধ্যে একধরনের প্রতারিত হওয়ার বোধ তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা নিয়ে আরও এক দফা আলোচনা হতে পারত। সেখানে বিরোধী দল ও সরকারি দল—উভয় পক্ষই উপস্থিত থাকত। এতে সিদ্ধান্তটির একটি গণবৈধতা থাকত। কিন্তু এখন এটি একদলীয় হওয়ায় এর কোনো বৈধতা থাকবে না।’
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমরা তখন থেকেই দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করছে বলে মনে হচ্ছে না। একপর্যায়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেব বলেন, ‘আমরা আসলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ভয় পেয়েছিলাম যে, তারা যদি নির্বাচন না দেয়। এ কারণে আমরা এসব মেনে নিয়েছি।’ অর্থাৎ, তারা আসলে এই চেতনাকে ধারণ করেন না; বরং কৌশলগত কারণে এসব করেছেন। জনগণ বিষয়টিকে প্রতারণা হিসেবে দেখছে।’
পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনসহ ৯টি সংস্কারের সিদ্ধান্তে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে বিএনপির। যা থেকে সরে আসতে চাইছে না তারা। অভিযোগ, জনগণকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে বিরোধীরা।
অভিযোগ নাকচ করে সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘জুলাই সনদ সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে যা যা রয়েছে, আমরা সবই বাস্তবায়ন করব। এগুলো সংশোধনী আকারে সংসদে আসবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটি একটি সুপারিশ পেশ করবে। কমিটির সুপারিশে কিছু বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা থাকতে পারে। তবে সুপারিশটি সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ হবে। সংসদে কোন বিষয় গ্রহণ করা হবে আর কোনটি হবে না, সে সিদ্ধান্ত সংসদেই নেয়া হবে। কমিটির কাজ হলো শুধু সুপারিশ পেশ করা, এর বাইরে আর কিছু নয়।’
তবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান।
অন্যদিকে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি আলী রীয়াজ জানান, ‘একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি সেই প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছেন কি না। অস্বীকার করে কি কোনো অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব? যদি তা-ই হতো, তাহলে তখনই এই প্রক্রিয়া অস্বীকার করার প্রয়োজন ছিল। এই চুক্তি বাস্তবায়ন ও এর শর্তগুলো পালন করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। ফলে তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে। নাগরিকদেরও প্রশ্ন তুলতে হবে, আপনাদেরও প্রশ্ন তুলতে হবে যে, কেউ এই প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন কি না।’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, সবাই তাগিদ দিয়েছিলেন, যেন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও তা মনে করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও একই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। নাগরিকদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না, এটাই দুর্ভাগ্যজনক।
ফ্যাসিবাদের পতনের পর, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর সই হয় জুলাই সনদ। এর অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হয় গণভোট। তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট প্রথমে এমপি এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তবে, শুধু এমপি হিসেবে শপথ নেন বিএনপি সংসদ সদস্যরা।