ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাউকে আবেদন করতে হবে না। যেতে হবে না কোনও সরকারি দফতরেও। সরকারের নিয়োগ করা তথ্য সংগ্রহকারীরাই পৌঁছে যাবেন প্রতিটি পরিবারের দরজায়। কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর কে ভাতা পাবেন, আর কে বাদ পড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা তথ্য সংগ্রহকারীরাও। পরিবারের আয়, সম্পদ, জীবনযাত্রার মানসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা। ভুল তথ্যের কারণে কোনও দরিদ্র পরিবার বাদ পড়লে থাকবে অভিযোগ, গণশুনানি ও আপিলের সুযোগ। সরকারের দাবি, এতে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ কমবে।
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের কোটি কোটি পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য একক ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার এই বিশাল কর্মসূচিতে বড় পরীক্ষা হবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা। মাঠপর্যায়ে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি। কারণ একটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহে সামান্য ভুলও তার ভাতা পাওয়ার যোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করলেই যে অনিয়ম বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ফলে ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহির ওপর।
এদিকে, গত ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে সরকার। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’, সরকারি গেজেট এবং গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন কাঠামো, উপকারভোগী নির্বাচনের শর্ত, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ভাতা তিন শ্রেণির পরিবার
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় দেশের সব পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর পরিবারগুলোকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। এগুলো হলো, অতি দরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। সরকারের পরিকল্পনায় প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানকে কার্ডের আওতায় আনা হলেও নগদ ভাতা পাবেন প্রথম তিন শ্রেণির যোগ্য নারীপ্রধানরা।
গত ২০ আগস্ট প্রকাশিত সরকারি গেজেটে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রক্সি মিন্স টেস্ট বা পিএমটি পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান নির্ধারণের বিধান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৮৬০ বা তার কম স্কোর পাওয়া পরিবারকে নগদ সহায়তার উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে অঞ্চলভেদে ঝুঁকি ও জীবনযাত্রার পার্থক্য বিবেচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পিএমটি স্কোর নির্ধারণে পরিবারের আয়, সম্পদ, সদস্যদের পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসতবাড়ির অবস্থা, জমি এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারী এসব তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করবেন। তবে কোন প্রশ্নের উত্তরের জন্য কত নম্বর নির্ধারিত রয়েছে, তা তথ্য সংগ্রহকারী জানতে পারবেন না।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘তথ্য সংগ্রহকারীর দায়িত্ব শুধু নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা। কে ভাতা পাবেন, তা তিনি নির্ধারণ করবেন না। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপকারভোগীর যোগ্যতা নির্ধারণ করবে। মন্ত্রী জানান, এখানে রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা দেওয়া বা বঞ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়নি।’’
দরিদ্র হলেও যেসব কারণে ভাতা থেকে বাদ পড়তে পারেন
ফ্যামিলি কার্ডের চূড়ান্ত নীতিমালায় শুধু পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচনের কথা বলা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে অযোগ্যতার সুনির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, পরিবারের নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে বেতন ভাতা পেলে কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের সরকারি পেনশন গ্রহণ করলে নগদ ভাতার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। এ ছাড়া পরিবারের কোনও সদস্যের নামে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয় বা নির্দিষ্ট ধরনের বিনিয়োগ, বিআরটিএতে নিবন্ধিত নির্ধারিত মোটরযান, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কিংবা নির্ধারিত সীমার বেশি জমি ও সম্পদ থাকলেও নগদ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। কোনও পরিবারকে পিএমটি স্কোরে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও নীতিমালার অন্য অযোগ্যতার শর্ত প্রযোজ্য হলে তারা ভাতা থেকে বাদ পড়তে পারে।
ভুল তথ্য বা বাদ পড়ার অভিযোগ যাবে কোথায়?
ফ্যামিলি কার্ডের বাস্তবায়ন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। কোনও পরিবার তথ্য সংগ্রহের বাইরে থাকলে, যোগ্য হয়েও ভাতা না পেলে কিংবা অযোগ্য কাউকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সমাজকল্যাণের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোকে ‘সেবাকেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিয়ন সমাজকর্মীর সহায়তায় নাগরিকরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। অনলাইনেও অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। তিনি বলেন, ‘‘আপিলের সিস্টেম আছে। একটা অফলাইন, একটা অনলাইন।’’
মন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনও নাগরিক সেবাকেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী সেটি অনলাইন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। চূড়ান্ত নীতিমালায় প্রাপ্ত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে জেলা পর্যায়ে আপিল করা যাবে। আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্যও ১৫ কার্যদিবসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গণশুনানির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রাথমিক উপকারভোগী তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে বাদ পড়া পরিবার কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারবেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘এই ব্যবস্থা রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাদের ভাতা পাওয়ার কথা তারা যেন বাদ না পড়েন, আবার অযোগ্য কেউ যেন তালিকায় ঢুকে যেতে না পারেন।’’
তথ্য সংগ্রহে ৬৬ হাজার কর্মী, তদারকিতে একাধিক স্তর
সারা দেশে তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত রয়েছেন ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার। প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে বিশেষায়িত ট্যাবলেটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা রয়েছে। প্রত্যেক তথ্য সংগ্রহকারীকে একটি পরিবারের প্রায় ৫০ থেকে ৫১টি প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করতে হবে।
সরকারি নীতিমালায় দুর্গম পাহাড়ি, চর ও ইন্টারনেট সংযোগবিহীন এলাকায় অফলাইন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে পরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। এর পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন এবং নমুনাভিত্তিক পুনঃযাচাইয়ের বিধান রাখা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, ‘‘তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় পদধারীদের অন্তর্ভুক্ত না করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।’’
কোটি পরিবারের তথ্য, কতটা নিরাপদ থাকবে?
ফ্যামিলি কার্ড শুধু আর্থিক সহায়তা বিতরণের ব্যবস্থা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটি বড় পারিবারিক তথ্যভান্ডার। জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়-সম্পদ এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি হবে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’। এই তথ্যভান্ডারের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেইজের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস পদ্ধতির মাধ্যমে একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচি থেকে একই ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন কি না, তাও যাচাই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি নীতিমালায় তথ্য সুরক্ষায় এনক্রিপশন, দায়িত্বভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের অনুমতি, ডিজিটাল অডিট ট্রেইল, ব্যক্তিগত তথ্যের সীমিত ব্যবহার এবং অনুমোদনহীন প্রবেশ ঠেকানোর বিধান রয়েছে।
মাসে আড়াই হাজার টাকা, লক্ষ্য শুধু ভাতা নয়
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে, নারীদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানের নামে সরাসরি মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হবে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ‘‘সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে শুধু নগদ অর্থ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এর মাধ্যমে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন আসছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘একটি পরিবারের কাছে মাসে আড়াই হাজার টাকা কম মনে হতে পারে। কিন্তু যে নারী নিজের ওষুধ কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তার হাতে নিয়মিত এই অর্থ পৌঁছানো অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’’
প্রতিমন্ত্রী জানান, পাইলটিং পর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক নারী ভাতার অর্থ পরিবারের শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষার ব্যয় এবং নিজের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ আবার এই অর্থের একটি অংশ সঞ্চয়ও করছেন। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জানতে আরও সময় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, ম্যানিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি সম্মেলনে বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কর্মসূচিটিকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।
গত ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং উদ্বোধন করা হয়। জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৪৪ জেলার ৫৫ উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাইলটিংয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ৭১ হাজার ৮৩১ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। এই পর্যায়ে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরাসরি ভাতা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, সরকারি পরিকল্পনায় প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হলেও সেই লক্ষ্যমাত্রার পরিসংখ্যানগত ভিত্তি স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। বিবিএসের ২০২২ সালের জনশুমারিতে দেশের পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ এবং পরিবারপ্রতি গড় সদস্যসংখ্যা ছিল চারজন। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী পরিবারপ্রতি পাঁচ জন ধরে হিসাবের কথা বলেছেন। ফলে হালনাগাদ পরিবার সংখ্যার প্রাক্কলন এবং সদস্য সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি আরও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা হলে কর্মসূচির পরিকল্পনা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন সহজ হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। এটি তারেক রহমানের এক অনন্য আবিষ্কার। কারণ সমাজের নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের সাপোর্ট। অতীতে এত সংখ্যক মানুষকে এই পরিমাণে আর্থিক জোগান দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে কোনও দলীয় পরিচয় বিবেচনায় আনা হয়নি। প্রকৃত বঞ্চিত মানুষই পাবে।’
ফ্যামিলি কার্ডের নামে কতিপয় ব্যক্তি অর্থ আদায় করছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘সব সময়ই সুযোগসন্ধানী কিছু মানুষ অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে থাকে। তবে এবার এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ পড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া। সরকার সফটওয়্যারনির্ভর উপকারভোগী নির্বাচনের কথা বলছে, কিন্তু সফটওয়্যার নিজে তথ্য সংগ্রহ করে না। মাঠপর্যায় থেকে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দেওয়া হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতেও বৈষম্য তৈরি হতে পারে। তাই শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন যাচাই, গণশুনানি ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘একইসঙ্গে কোটি কোটি টাকার ভাতা বিতরণ করলেই দারিদ্র্য কমবে না। এই অর্থ নারীদের কতটা স্বাবলম্বী করছে, তারও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ফ্যামিলি কার্ডের সফলতা কার্ড বিতরণের সংখ্যা দিয়ে নয়, প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং তাদের জীবনমানের পরিবর্তন দিয়ে বিচার করতে হবে।’’