করোনাভাইরাস মহামারির জরুরি সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনবহুল মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার যে ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
মহামারির দিনগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে স্কুল-কলেজ, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে নতুন বেসিন এবং ট্যাপযুক্ত হাত ধোয়ার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সাবান-পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পরিচ্ছন্নতাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা।
তবে, বর্তমানে করোনার জরুরি পরিস্থিতি ও আতঙ্কের অবসান হলেও সংক্রমণ একেবারে থেমে যায়নি। অথচ স্থাপন করা হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুমের অবস্থাও বেহাল। রোগী ও তাদের স্বজনদের ব্যবহৃত ওয়াশরুমগুলো পরিচর্যার অভাবে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি এসব হাসপাতালে নারী-বান্ধব স্থান (ডব্লিউএফএ) ধারণার কার্যকারিতাও নেই।
করোনা মহামারির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনবহুল এলাকায় যেসব হাত ধোয়ার স্টেশন ও পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে সেগুলো এখন পুরোপুরি অকার্যকর বা উধাও হয়ে গেছে। সাবান ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে
পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও চরম বেহাল। ওয়াশরুমে পর্যাপ্ত পানি আছে কি না, নষ্ট ট্যাপ মেরামত করা হচ্ছে কি না কিংবা সাবান কেনার নিয়মিত বরাদ্দ রয়েছে কি না— এসব বিষয় তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বি এ হ্যান্ডওয়াশিং হিরো!’ (হাত ধোয়ার নায়ক হোন!)
রাজধানীর বড় বড় সরকারি হাসপাতালের ওয়াশরুমগুলো নোংরা ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে ওঠায় রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। অন্যদিকে, জরিপ অনুযায়ী দেশের প্রায় অর্ধেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধা নেই এবং মাত্র ১১.১ শতাংশ স্কুলে এই খাতে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রয়েছে
গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপ জানিয়েছে, এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো স্কুল, কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং পরিচ্ছন্নতাকে একটি সম্মিলিত অভ্যাসে রূপান্তর করা। তাই দিবসটিকে সামনে রেখে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণই নয়, বরং সেগুলোকে সচল রাখা, নিরবচ্ছিন্ন সাবান-পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

হাসপাতালে বেহাল দশা
অপরদিকে, সরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক নানা বার্তা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শত শত রোগী ও তাদের স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু সেই তুলনায় ওয়াশরুমের সংখ্যা খুবই কম। পুরুষদের জন্য রয়েছে মাত্র ৩টি ওয়াশরুম।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ওয়াশরুমগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা, বেশিরভাগ টয়লেটের ফ্লাশ নষ্ট এবং নেই কোনো সাবান, হ্যান্ডওয়াশ কিংবা টিস্যু। এমনকি কোথাও কোথাও পানি ব্যবহারের ট্যাপ কিংবা বদনা পর্যন্ত নেই।

মিজানুর রহমান নামের এক রোগীর স্বজন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে গত তিন দিন ধরে এখানে (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল) আসা-যাওয়া করছি। দীর্ঘ সময় এখানে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু কিডনি ও ইউরোলজির রোগীদের এখানে ওয়াশরুম ব্যবহার মানে এক ধরনের জুলুম।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল... তাই বলে অন্তত ব্যবহার উপযোগী তো রাখতে হবে। মনে হচ্ছে গত ১০ দিনেও পরিষ্কার করা হয়নি। এত বাজে অবস্থা।’
আঞ্জুমান আরা নামে এক রোগী ওয়াশরুম থেকে নাকে কাপড় দিয়ে বের হন। তিনি বলেন, ‘এটা টয়লেট না বলে ময়লার ভাগাড় বলাই ভালো। একটি হাসপাতালে যেখানে কিডনি ও ইউরোলজির রোগীরা চিকিৎসা নেন, এই ধরনের রোগীদের ঘনঘন ওয়াশরুমে যেতে হয়। অথচ ওয়াশরুমগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।’

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থাও একই রকম। সেখানে অধিকাংশ রোগীর স্বজনকে ওয়াশরুম ব্যবহার না করে বাইরে গিয়ে অন্য ওয়াশরুম খুঁজতে দেখা গেছে। সাব্বির মাহমুদ নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘এত বড় হাসপাতাল, অথচ এখানকার টয়লেট ও ওয়াশরুমগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভাগাড়ে এসেছি নাকি হাসপাতালে। এখানে এলে তো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বেন! সাবান-হ্যান্ডওয়াশ তো দূরের কথা, টিস্যু পর্যন্ত নেই।’
উধাও হাত ধোয়ার উদ্যোগ
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এর ফলে মানুষের মধ্যে ঘনঘন হাত ধোয়া, বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে গোসল করা, পরনের কাপড় পরিষ্কার করা এবং শাকসবজি ধোয়ার একটি ভালো অভ্যাস গড়ে ওঠে। তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাসাবাড়ি ও প্রধান প্রধান সড়কে নিয়মিত জীবাণুনাশক ছিটানোর দৃশ্যও দেখা গেছে।
সাবান দিয়ে হাত ধুলে ডায়রিয়াসহ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অন্তত ৪০ শতাংশ কমে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু দিবস কেন্দ্রিক প্রচার নয়; বরং হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে স্থায়ী অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি
এ সচেতনতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন কাঁচাবাজার, বাস ও ট্রেন টার্মিনাল এবং আবাসিক ভবনের প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পানির ট্যাংক বসায়। এমনকি সুইডিশ দূতাবাস ও ঢাকা ওয়াসার যৌথ উদ্যোগে ‘হ্যান্ড ওয়াশিং অন হুইলস’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচিও চালু করা হয়েছিল। এর আওতায় হাত ধোয়ার সুব্যবস্থাসম্পন্ন ১০টি ভ্যান ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াত এবং সেগুলোতে ওয়াসা বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করত।
তবে, সময়ের ব্যবধানে সেই ইতিবাচক উদ্যোগগুলো এখন আর নেই। ওয়াসার পক্ষ থেকে বসানো পানির ট্যাংকগুলোর বেশিরভাগই এখন আর নেই। যেখানে দু-একটি ট্যাংক বা বেসিন এখনও রয়েছে, সেগুলোতে পানি নেই। কোথাও আবার নষ্ট বেসিনগুলোতে জমেছে ময়লা-আবর্জনা।

সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাংলামোটর পুলিশ বক্সের পাশে ওয়াসার যে পানির ট্যাংকটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটি আর সেখানে নেই। ওয়াসার পক্ষ থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড় ও ওয়াসা ভবনের সামনেসহ বিভিন্ন মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংক বসানো হয়েছিল, সেই ট্যাংকগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারওয়ান বাজার মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে বসানো পানির ট্যাংকটিও কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যায়, পরে স্থানীয়রা সেখান থেকে ট্যাংকটি সরিয়ে ফেলেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও করুণ চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’-এর ফলাফল অনুযায়ী, দেশে মাত্র ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মৌলিক সেবা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রয়েছে।
ওই জরিপে দেখা যায়, দেশের ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পানির উৎস থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পানির সুবিধা রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানের হার ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ। আবার মাত্র ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীবান্ধব উন্নত পানির পয়েন্ট রয়েছে।

জরিপে আরও দেখা যায়, মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়াশ খাতে নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে। নিয়মিত বরাদ্দ না থাকলে একটি বেসিনের ট্যাপ নষ্ট হওয়া, পানির পাইপে সমস্যা দেখা দেওয়া কিংবা সাবান শেষ হয়ে যাওয়ার মতো ছোট সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকে।
অপরদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে অবশ্য বরাদ্দের নজির রয়েছে। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ৫১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩ হাজার ৪১২টি ওয়াশ ব্লকের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ২৩ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছাড়ের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি ওয়াশ ব্লকের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার টাকা।
পিইডিপি-৪-এর রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন বিদ্যালয়ে কতটুকু কাজ হয়েছে, কতটি ওয়াশ ব্লক সচল রয়েছে এবং কতগুলোতে মেরামতের প্রয়োজন, এসবের হালনাগাদ ও সমন্বিত চিত্র এবং অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়নের তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নেই।
করোনাকালে স্কুল খোলা ও পুনরায় চালুর প্রস্তুতির সঙ্গে হাত ধোয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে ইউনিসেফ শিক্ষকদের হাত ধোয়ার নিয়ম শেখানো, পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রাখা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছিল।
ইউনিসেফের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, নিরাপদ প্রবাহমান পানিতে হাত ভিজিয়ে পর্যাপ্ত সাবান দিয়ে হাতের তালু, উল্টো পিঠ, আঙুলের ফাঁক ও নখের নিচসহ সব অংশ অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ঘষে ধুতে হবে। এরপর পরিষ্কার পানিতে হাত ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে খাবারের আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পরে এবং নাক-মুখ পরিষ্কারের পর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল।
সম্প্রতি মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বেশ কয়েকটি ওয়াশরুম ও টয়লেট রয়েছে। তবে, জরুরি ভিত্তিতে স্থাপন করা হাত ধোয়ার বেসিন বা ওয়াশ সেন্টারগুলো পুরোপুরি অকেজো।
হাত না ধোয়ার নীরব খেসারত
হাত ধোয়ার সুবিধা না থাকার পরিণতি শুধু পরিচ্ছন্নতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দূষিত হাতের মাধ্যমে জীবাণু খাবার, পানি ও মুখে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া থেকে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা গুরুতর হলে প্রাণঘাতীও হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর ফলাফল অনুযায়ী, জরিপের আগের দুই সপ্তাহে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৭ দশমিক ১ শতাংশের ডায়রিয়ার আক্রমণ হয়েছিল। শহরাঞ্চলে এই হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বিভাগভেদে চট্টগ্রামে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বরিশালে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর ডায়রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এই পরিসংখ্যান পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে। জরিপে পাওয়া ডায়রিয়ার সব ঘটনা শুধু হাত না ধোয়ার কারণে হয়েছে, তা বলা যায় না। দূষিত পানি, অনিরাপদ খাবার, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও অন্যান্য কারণও ডায়রিয়ার জন্য দায়ী। তবে, হাত ধোয়া এসব সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ডায়রিয়ার ঝুঁকি অন্তত ৪০ শতাংশ কমাতে পারে। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাই হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা কেবল সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি পালনের বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতা কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশে পরিবারের মধ্যেও হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের বাসস্থানে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার সুবিধা রয়েছে। শহরে এ হার ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও গ্রামে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ বাড়িতেও উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর জন্য পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত নয়।
এ বাস্তবতা বিদ্যালয়গুলোর দায়িত্বকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। স্কুলে শিশুদের নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস শেখানো গেলে তা বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শুধু সচেতনতামূলক পোস্টার বা এক দিনের কর্মসূচি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর অবকাঠামো, নিয়মিত উপকরণ সরবরাহ ও তদারকি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা, অতিরিক্ত দায়িত্ব) এহতেশামুল রাসেল খান অফিসিয়াল অনুমোদন ছাড়া তথ্য দিতে রাজি হননি।
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের ওয়াশ সেক্টরের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মো. শাহীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শুধু হাত ধোয়ার গুরুত্ব প্রচার নয়, বরং মানুষ যাতে বাস্তবে হাত ধুতে পারে, সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেসিন-ট্যাপ সচল রাখা, নিরাপদ পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সাবান কেনার নিয়মিত অর্থের সংস্থান এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নির্ধারণ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার এবং শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে হাত ধোয়ার মতো সহজ একটি অভ্যাস জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা জরুরি। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি শুধু মহামারির সময়ের জরুরি ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অবকাঠামো নির্মাণের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) এ কে এম ফজলুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।