বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীর সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রিসভায় নতুন পাঁচ মুখ যোগ হওয়া এবং একজন বিদায়ের পর এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ জনে। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। মন্ত্রি-প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে বসে দৈনন্দিন কাজ করছেন। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা কোথায় বসেন এবং কী কাজ করেনÑএটি নিয়েও মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের ওপর অর্পিত নির্বাহী দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। নির্বাহী আদেশে নিয়োগ পাওয়া এবং শপথবিহীন এসব উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করে থাকেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা এবং প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় বেশ কয়েকজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছেন। সংখ্যার বিচারে এটি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের কাজের গতি বাড়াতে প্রয়োজনের তাগিদেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তরা সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করে চলেছেন।
বর্তমান সরকারে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টারা হলেনÑমির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, ইসমাইল জবিউল্লাহ, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও জহির উদ্দিন স্বপন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টারা হলেনÑ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামছুল ইসলাম, ড. মাহদী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ ও ডা. জাহেদ-উর রহমান। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বিশেষ সহকারী করা হয়েছে বিজন কান্তি সরকার, ড. এস এম জিয়াউদ্দিন ও তানভীর গনিকে।
প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আরো দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা হলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ ও জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান। সচিব মর্যাদায় বিশেষ সহকারী হিসেবে আছেন রাশেদ খান, সাইমুম পারভেজ, শাকিরুল ইসলাম খান ও গিয়াস উদ্দিন রিমন (সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত) এবং অতিরিক্ত সচিব মর্যাদায় যুববিষয়ক বিশেষ সহকারী সাঈদ বিন আবদুল্লাহ।
এর আগে পলাতক শেখ হাসিনা সরকারের সময় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় ছয়জন উপদেষ্টা এবং পাঁচজন বিশেষ সহকারী ছিলেন। অবশ্য ওই সরকার বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ কয়েকটি পদের দায়িত্বশীলদের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভার বৈঠকের এখতিয়ারভুক্ত না হলেও হাসিনার সরকার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আদেশ জারির মাধ্যমে তাদের বৈঠকে অংশগ্রহণের বিধান করেছিল । সমালোচনার মুখে পরে অবশ্য তাদের মন্ত্রিসভার বৈঠকের বাইরে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময় উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিশেষ কোনো আদেশ জারি হয়নি। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনো উপদেষ্টার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এজেন্ডা থাকলে তিনি বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নেন।
উপদেষ্টারা কোথায় বসেন- কী করেন?
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সমন্বয়, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, প্রতিরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছেন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা। কেউ মন্ত্রীর পদমর্যাদায়, কেউ প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থেকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পরামর্শ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের নীতিগত কার্যক্রমেও তাদের ভূমিকা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পরামর্শ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের দায়িত্বে রয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক মির্জা আব্বাস এমপি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে অফিস ও প্রয়োজনীয় লোকবল বরাদ্দ রয়েছে। বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ থাকায় কার্যালয়ে আসতে না পারলেও কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দাপ্তরিক কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখভালের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন। তার জন্য সচিবালয়ের কৃষি মন্ত্রণালয়ে অফিস প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তিনি এখানেই নিয়মিত অফিস করবেন বলে তার দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্বের সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। তার জন্য তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস বরাদ্দ রয়েছে। সেখানেই তিনি দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ অফিস করেন সচিবালয়ের নতুন এক নম্বর ভবনের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সাবেক এ সচিব পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার আমলে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে জোরালো ভূমিকা রাখেন। হাসিনার পতন ও পলায়নের পর জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিনি মুয়ীদ কমিশনের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে সুপারিশমালাও পেশ করেন। কমিশনের প্রতিবেদনে তা বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তিনি জনপ্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি তদারকি করে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রীর অপর উপদেষ্টাদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নির্ধারিত দপ্তরে নিয়মিত অফিস করছেন। সেখানে তার জন্য নির্ধারিত লোকবলও রয়েছে।
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন। সেখানে তার নির্ধারিত দপ্তর ও লোকবলও রয়েছে। সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এছাড়াও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় চারজন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। তার অফিস প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
ড. মাহদী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সচিবালয়ে ৬ নম্বর ভবনের ১৭ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত অফিস করেন। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করে আসছেন তিনি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন রেহান আসিফ আসাদ। তার অফিস সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে।
প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন ডা. জাহেদ-উর রহমান। সচিবালয়ে ৬ নম্বর ভবনের ১২ তলায় তার জন্য দপ্তর রয়েছে। সেখানেই তিনি নিয়মিত অফিস করেন। মন্ত্রণালয়গুলোর বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সাংবাদিকদের নিয়মিত ব্রিফিং করে আসছেন।
কোথায় অফিস করেন বিশেষ সহকারীরা
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীরাও বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় নিযুক্ত বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠীবিষয়ক বিষয়াদি দেখভাল করে আসছেন। সাবেক এ কর্মকর্তা অফিস করেন সচিবালয়ে পুরোনো ১ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায়। সেখানে তার দপ্তর ও প্রয়োজনীয় লোকবল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়, তানভীর গনি সরকারের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বিষয়গুলো তদারকি করে আসছেন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিযুক্ত এ বিশেষ সহকারী অফিস করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি সচিবালয়ের পুরোনো ১নং ভবনে অফিস করেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়াদি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান। তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে অবস্থিত প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৬ তলায় পৃথক দপ্তর ও লোকবল বরাদ্দ রয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মো. সাইমুম পারভেজ। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে তার দপ্তর রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. রাশেদ খান। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সামনের সারির অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক থেকে পদত্যাগ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেন। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিভিন্ন টিভি টকশোসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের পক্ষে বয়ান তৈরিতে সরব ভূমিকা পালন করেন। তার কিছুকিছু বক্তব্য বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে।
এছাড়াও সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ যুব কর্মসংস্থান বিষয়ক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দপ্তর রয়েছে। সর্বশেষ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গিয়াস উদ্দিন রিমন। তার জন্য সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৯ তলায় দপ্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীতে রেকর্ড
বর্তমান সরকারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীর সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রিসভায় নতুন পাঁচ মুখ যোগ হওয়া এবং একজনের বিদায়ের পর এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ জনে।
সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভার আকার আরো বড় হয়েছে। এতে যুক্ত হয়েছেন চারজন মন্ত্রী এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমান প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। আর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন হুমায়ুন কবির। রদবদলের পর মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর এটি তৃতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভা। তবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী এবং সচিব মর্যাদার বিশেষ সহকারী রয়েছেন ২০ জন। সর্বশেষ এ দলে যোগ হয়েছেন রিমন। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে।
তাদের মধ্যে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা রয়েছেন ছয়জন, প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা চারজন এবং প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বিশেষ সহকারী ও অন্যান্য পদে রয়েছেন পাঁচজন। এছাড়া সচিব মর্যাদায় তিনজন এবং অতিরিক্ত সচিব মর্যাদায় একজন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অতীতে কোনো সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও অন্যান্য পদে কর্মরতদের সংখ্যা ৭১ জনের উপরে ছিল না। একমাত্র পতিত স্বৈরাচার হাসিনার সরকারে একবার এই সংখ্যা ৭০ জন ছিল।
কেমন ছিল জোট ও মহাজোটের মন্ত্রিসভা
খালেদা জিয়ার তৃতীয় মন্ত্রিসভা শপথ নেয় ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর। এই মন্ত্রিসভায় খালেদা জিয়াসহ ২৮ জন পূর্ণ মন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। যা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভা ছিল। এ নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। সেই মন্ত্রিসভার অন্তত সাতজন পদত্যাগ করেন বিভিন্ন সময়ে। ২০০৬ সালের অক্টোবরে সরকারের শেষ সপ্তাহে চার প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করে যোগ দেন বিএনপি ছেড়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের গঠন করা এলডিপিতে।
ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পদত্যাগ করেন মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা। পদত্যাগ করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী এল কে সিদ্দিকীও। শেষদিকে এসে পদত্যাগ করেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তারা ২০০৪-২০০৬ সালের মধ্যে পদত্যাগ করেন। চট্টগ্রামের মেয়র পদে নির্বাচন করে হেরে যাওয়ার পর অভ্যন্তরীণ বিরোধে ২০০৫ সালে পদত্যাগ করেছিলেন টেকনোক্র্যাট কোটার প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন।
টেকনোক্র্যাট কোটার আরেক প্রতিমন্ত্রী বরকতউল্লা বুলুকে পদত্যাগ করতে হয় ২০০৩ সালে। তবে তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে সরকারের শেষদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জাহানারা বেগম। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা ছিলেন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও জ্বালানি উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান। খালেদা জিয়ার তৃতীয় সরকারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং একই পদমর্যাদায় ৬৪ জন দায়িত্ব পালন করেন।
হাসিনার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। সেদিন প্রধানমন্ত্রীসহ ২৪ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং আটজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। এরপর মন্ত্রিসভায় আরো ছয়জন নতুন সদস্য যুক্ত হন। একই বছরের ৩১ জুলাই মন্ত্রিসভায় দুজন পূর্ণ মন্ত্রী এবং চারজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। এতে মন্ত্রিসভার আকার হয় ৪৪ জনে।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে ওবায়দুল কাদের ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রী হন। ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাসানুল হক ইনুসহ পাঁচজন মন্ত্রী এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৩ সালের নভেম্বরে তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন, রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদারসহ ছয়জন মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী হন দুজন। এতে মন্ত্রিসভার আকার হয় ৬১। তবে একইদিনে ৩২ জন পদত্যাগ করেন। ওইদিন হাসিনা তথাকথিত নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের নামে মন্ত্রিসভার আকার ছোট করেছিলেন এবং এতে জাতীয় পার্টি ও বাম দলকে যুক্ত করা হয়েছিল।
তাদের দুজন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হন। নিয়োগ পান আরো দুই উপদেষ্টা। আগে থেকেই ছিলেন সাতজন। এই হিসাবে হাসিনার দ্বিতীয় সরকারে ৭০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সমপদমর্যাদার ছিলেন।
সংবিধান ও আইন কী বলছে?
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনা রয়েছে। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে গতিশীলতা আনতে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিতে পারেন।
রুলস অব বিজনেসের (১৯৯৬) রুল ৩বি-এর বিধান মেনে উপদেষ্টারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা বা বিশেষায়িত কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রমতে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উপদেষ্টাগণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করছেন। তারা ক্যাবিনেট বৈঠক বা বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারণী সভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অংশগ্রহণ করতে পারেন। আর বিশেষ সহকারীরা প্রধানমন্ত্রীর দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজ, বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় ও তদারকি করে থাকেন। কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
যদিও রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী তারা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ও মুখ্য সচিব হিসেবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিযুক্ত রয়েছেন।
উল্লেখ্য, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা সরকারপ্রধানকে নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সাহায্য করলেও ফাইল অনুমোদনের এখতিয়ার রাখেন না। তারা মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বর্ধিত অংশ হিসেবে কাজ করেন। তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করে থাকেন। অবশ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন বিশেষ সহকারীকে নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।