২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর। মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় নরওয়ের নোবেল কমিটি। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ঠিক দুই দশক পর, ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর, সেই নোবেল ঘোষণার বার্ষিকীতে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ইউনূস।
এর আগের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাকে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট’ (আপনি একজন সন্ত্রাসী) এবং ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার’ (আপনি এখানে কেন এসেছেন) বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
১৩ অক্টোবর ২০০৬-এ নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ইউনূসের জীবনে এরপর বহু ঘটনা ঘটেছে। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার প্রবক্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যেমন পেয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধ, শ্রম আইনসংক্রান্ত মামলা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে তার ভূমিকা ঘিরে নানা প্রশ্নের মুখেও পড়েছেন। অবশ্য এসব অভিযোগের সব কটির প্রকৃতি এক নয়; কিছু বিষয়ে আদালতের রায় রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক বিতর্ক।
নিউইয়র্কের বিমানবন্দরের ঘটনাটি নিয়ে ১৩ অক্টোবর দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে হুইলচেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। কয়েকজন তার কাছে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের একজন ইউনূসকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেন এবং বাংলাদেশে মানুষ হত্যা, গ্রেপ্তার ও গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন।
নিউইয়র্কের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইউনূসের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা চলছিল। ১১ অক্টোবর শুরু হওয়া তিন দিনের ওই সম্মেলনে তার যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অংশ নিতে পারেননি। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আয়োজকদের বরাতে তার অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা বলা হয়। সম্মেলনের ওয়েবসাইটে আগে বক্তা হিসেবে তার নাম থাকলেও পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।
ওই সম্মেলনে ইউনূসের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি ছিল। তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইউরোপভিত্তিক পাঁচটি সংগঠন আয়োজকদের কাছে চিঠি দিয়ে তার অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। সংগঠনগুলোর আপত্তির কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, টিকার সরবরাহ এবং জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন। তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন এবং আলোচনায় আক্রান্ত শিশুদের পরিবার, শিশু চিকিৎসক ও স্বাধীন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা উচিত।।
ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মানবাধিকার পরিস্থিতিও তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে বিতর্কের একটি বড় ক্ষেত্র। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৬-এ বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সমস্যায় পড়ে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে জনতার হামলায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হন।
প্রতিবেদনটিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের নির্বিচার আটকের অভিযোগ, জনতার সহিংসতা এবং নারী ও যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার বিষয়ও উঠে এসেছে। তবে মানবাধিকার পরিস্থিতির মূল্যায়নে আগের সরকারের সময়কার নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একই সঙ্গে উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গুম ও দমন-পীড়নের কিছু পুরোনো প্রবণতা কমে এলেও নতুন সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটক করার মতো সমস্যাও অব্যাহত ছিল।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও ইউনূস সরকারের সময়ের অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সরকার জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি সামনে আনে। অন্যদিকে, দলটির নেতারা সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার আইনি ভিত্তি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়নে, অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আটক, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং জনতার সহিংসতা মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা ছিল। এসব অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম শর্ত হলো ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইউনূসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুনে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রায় ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরও ১৩ জনের সঙ্গে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল বলে রয়টার্স জানায়। অর্থ পাচারের অভিযোগও ছিল। ইউনূস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে হয়রানিমূলক বলে দাবি করেছিলেন।
এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থায়ন ও অনুদানের অর্থ স্থানান্তর নিয়েও অতীতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকে ২০১০ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তর নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রচার করে। এ বিষয়ে ইউনূসের বক্তব্য ছিল, অনুদানের অর্থ এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের পদ্ধতি নিয়ে দাতাদের সঙ্গে মতপার্থক্য হয়েছিল; বিষয়টিকে অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। তার দাবি অনুযায়ী, নরওয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল।
২০০৬ সালে নোবেল কমিটি ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার কারণ হিসেবে বলেছিল, তারা তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। কমিটির যুক্তি ছিল, বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ না পেলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; ক্ষুদ্রঋণ সেই পথের একটি উপায়।
১০ ডিসেম্বর ২০০৬-এ অসলো সিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি মোসাম্মৎ তাসলিমা বেগম পুরস্কারের পদক ও সনদ গ্রহণ করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের প্রতিনিধি হিসেবে তাসলিমা বেগমের পুরস্কার গ্রহণও ছিল ওই অনুষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য দিক।
দুই দশক পর ইউনূসের নোবেলজয়ের বার্ষিকীতে তাই দুটি ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এসেছে। একদিকে ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানের জন্য তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি; অন্যদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব, মানবাধিকার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক। নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে তাকে লক্ষ্য করে দেওয়া ‘সন্ত্রাসী’ স্লোগান সেই বিতর্কেরই একটি নতুন ঘটনা। নোবেল পুরস্কার পাওয়াও পরবর্তী সময়ে ওঠা অভিযোগ বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে কাউকে স্থান দেয় না।