Image description

করোনা মহামারীর লকডাউন শেষে শিশুরা যখন আবার স্কুলে ফিরল, আয়ারল্যান্ডের ছোট শহর গ্রেস্টোনসে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল র‍্যাচেল হারপারের।

স্কুলের গেটে কান্না করছিল অনেক শিশু। কেউ স্কুলে ঢুকতে চাইছিল না। কারও রাতে ঘুম হচ্ছিল না।

কেউ আবার ক্যালরি গোনার অ্যাপ ডাউনলোড করছিল। রাতে পাওয়া বিভিন্ন বার্তার প্রভাব এতটাই ছিল যে পরদিন ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছিল না অনেকে।

রাজধানী ডাবলিনের দক্ষিণে সমুদ্রতীরের এই শহরের সেন্ট প্যাট্রিকস ন্যাশনাল স্কুলের প্রধান হারপার। তিনি অন্য স্কুলের প্রধানদের সঙ্গে কথা বললেন। সেখানেও একই চিত্র।

অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছিল। শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো একটি জরিপ চালায়। প্রায় ৮০০ পরিবার এতে অংশ নেয়। অর্ধেকের বেশি পরিবার জানায়, তাদের সন্তান উদ্বেগে ভুগছে। অনেক পরিবার এরই মধ্যে সাহায্যও নিয়েছে।

স্কুলে ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না। কারণ স্মার্টফোন তখনো শিশুদের ঘরে ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব তাদের সঙ্গে স্কুলেও চলে আসছিল।

তখন গ্রেস্টোনস নিল ভিন্ন সিদ্ধান্ত। শহরের আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক সংগঠন একসঙ্গে একটি স্বেচ্ছামূলক ‘স্মার্টফোন নয়’ নীতি গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত হলো, সন্তান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার আগে তাকে স্মার্টফোন কিনে না দেওয়ার চেষ্টা করবেন অভিভাবকরা।

ভাবনাটা ছিল খুব সহজ। সবাই যদি একই সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কোনো শিশুর মনে হবে না যে শুধু তার কাছেই স্মার্টফোন নেই। আবার সন্তানকে ‘না’ বলাও অভিভাবকদের জন্য সহজ হবে।

প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবক এতে সই করেন। স্থানীয় রাজনীতিকরাও পাশে দাঁড়ান। উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয় ‘ইট টেকস আ ভিলেজ’।

গ্রেস্টোনসের অভিভাবকরা প্রথমে মূলত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন গবেষণায় তাদের উদ্বেগের পক্ষে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

জার্নাল অব হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাবিলিটিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন পাওয়ার সঙ্গে আত্মহত্যার চিন্তা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।



চিলড্রেনস হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়া, ইউসি বার্কলে ও কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দেখেছেন, ১২ বছর বয়সে নিজের স্মার্টফোন থাকার সঙ্গে বিষণ্নতা, স্থূলতা ও ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। আরও কম বয়সে ফোন পেলে ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি।

তবে সব গবেষণার ফল একই নয়।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের স্মার্টফোন থাকা শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কথা জানানোর হার বরং কম। তারা বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি সময়ও বেশি কাটায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে পোস্ট করার সঙ্গে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উচ্চ হারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু ফোনে নয়। শিশুরা ফোন দিয়ে কী করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিন বছর পরও গ্রেস্টোনস দাবি করছে না যে তারা সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে।

শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারীপ্রধান ইওন ক্লিয়ারি এই উদ্যোগকে স্থায়ী সমাধান নয়, বরং কিছুটা সময় কেনার উপায় হিসেবে দেখছেন। শিশুরা এখনো বয়সের বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেয়। অভিভাবকদের ওপর চাপও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

 

তবে পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষকরা বলছেন, সকালে শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে বেশি সজাগ থাকে। অভিভাবকরা বলছেন, স্মার্টফোন কেনা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে আগের মতো তর্ক হয় না। শিশুরা সামনাসামনি পরিকল্পনা করছে। বাইরে সময়ও বেশি কাটাচ্ছে।

গ্রেস্টোনসের এই ছোট উদ্যোগ এখন আর শুধু একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও এ উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে। ব্রিটেনের ‘স্মার্টফোন ফ্রি চাইল্ডহুড’ আন্দোলনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেইজি গ্রিনওয়েল জানিয়েছেন, তাদের উদ্যোগের সরাসরি অনুপ্রেরণা ছিল গ্রেস্টোনস।

আয়ারল্যান্ডের শিক্ষা বিভাগও একই পথে যেতে আগ্রহী স্কুলগুলোর জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এই উদ্যোগ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই দেশটিতে একটি জাতীয় অনলাইন হেলথ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

গ্রেস্টোনসের অভিজ্ঞতা তাই শুধু শিশুদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখার গল্প নয়। এর বড় শিক্ষা অন্য জায়গায়—একজন অভিভাবকের পক্ষে যে ‘না’ বলা কঠিন, পুরো একটি সমাজ একসঙ্গে দাঁড়ালে সেই ‘না’ বলাই অনেক সহজ হয়ে যায়।

সূত্র : ফার্স্টপোস্ট