Image description

আশির দশকে গ্রামবাংলায় মেয়েদের স্কুলে পাঠানোই ছিল অনেক পরিবারের কাছে সামাজিক ঝুঁকি। প্রচলিত ধারণা ছিল ‘নারী কুড়িতে বুড়ি’। সেই সময় সমাজের নানা বাধা উপেক্ষা করে মেয়েদের শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রামুর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ঘোনারপাড়ার উলামিয়া। মাদ্রাসার শিক্ষকদের আপত্তিও তাকে থামাতে পারেনি।

উলামিয়ার ১৩ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে বর্তমানে আট মেয়েই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছেলেদেরও কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যেও শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন রাখেননি উলামিয়া। সবার উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবারটি যে ত্যাগ করেছে, সেটিই আজ তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আট বোন হলেন হুসনে আরা বেগম, সাবেকুন্নাহার কাজল, মুজিবুন্নাহার, রিজিয়া আক্তার, সেলিনা আক্তার, তাহমিদা ইয়াছমিন, ফাহমিদা ইয়াছমিন ও শারমিন আফরোজ নওরীন। তারা বান্দরবান, হাটহাজারী, চকরিয়া, রামু ও রাউজানের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বড় বোন হুসনে আরা বেগম বলেন, বাবা সবসময় বলতেন, মেয়েদের শিক্ষিত হতে হবে। উনার স্বপ্ন পূরণ করতেই আমরা শিক্ষকতায় এসেছি। এখন গ্রামের শিশুদের পড়াতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে হয়।

 

পরিবারের আরেক সদস্য আনোয়ারা বেগমের শৈশবও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি জানান, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তার ক্লাসে অনেক ছেলে শিক্ষার্থীর বিপরীতে তিনিই ছিলেন একমাত্র মেয়ে শিক্ষার্থী।

 

উলামিয়ার বড় ছেলে ও রামু সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছলিম উল্লাহ বলেন, ‘‘বাবা বলতেন, শিক্ষাই সম্মান। তার দেখানো পথেই আজ আট বোন হাজারো শিশুর জীবন গড়ছে।” বাবার মৃত্যুর পর নিজের ক্যারিয়ারের অনেকটা বিসর্জন দিয়ে ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার কথাও জানান তিনি।

 

জোয়ারিয়ানালা ইউপি চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন মো. প্রিন্স বলেন, উলামিয়ার পরিবারটি এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। রামু উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. হানিফ মিয়াও একই পরিবারের আটজন শিক্ষক হওয়াকে বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রামুর কৃতী সন্তান ও সাবেক সচিব মাফরুহা সুলতানার মতে, সামাজিক ও ধর্মীয় নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও উলামিয়া তার মেয়েদের শিক্ষিত করে শুধু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাননি; তৈরি করেছেন দেশ ও সমাজ গঠনের একদল মানুষ। এ সাফল্যের পেছনে মায়ের ত্যাগও অনস্বীকার্য।

চার দশক আগে যে পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার জন্য সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছিল, আজ সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মেও তার ছাপ স্পষ্ট। নাতি-নাতনিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস ক্যাডার, চিকিৎসক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী।

একটি পরিবারের শিক্ষার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, যার কেন্দ্রে রয়েছেন এক বাবা, এক মা এবং তাদের ১৬ সন্তানের শিক্ষার গল্প।