ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে আফসানা হাউজিংয়ের কার্যালয়ে গত রোববার হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করা হয়। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. নাসিরের অভিযোগ, ৪০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এ হামলা চালানো হয়েছে।
তার দাবি, লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।
কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে অফিসের সামনে একটি ছোট ট্রাক এসে থামে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ জন যুবক কার্যালয়ে ঢুকে বিভিন্ন কক্ষের দরজা ভাঙতে থাকেন। তাদের কারো হাতে ছিল রামদা, কারো হাতে লাঠিসোঁটা। একপর্যায়ে তারা কার্যালয়ের সোফা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব বাইরে নিয়ে ট্রাকে তোলেন। পরে ট্রাকটি নিয়ে চলে যান তারা।
ঘটনার কয়েক দিন পর গত বুধবার সরেজমিনে কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভাঙচুরের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার নাসির বলেন, ‘এই রুমে এসি ছিল। সেটা খুলে নিয়ে গেছে। এর বাইরের অংশও খুলে নিয়ে গেছে। দামি সোফা, টেবিল, নগদ টাকা, টিভি, গিজার—সব নিয়ে গেছে।’
নাসিরের ভাষ্য, হামলার আগে তাদের কাছে ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। ওই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় হামলা চালিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক সজীব ব্যাপারী ঘটনার পরদিন কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। তার অভিযোগ, সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ভাড়া করে এ হামলা চালানো হয়েছে।
সজীব ব্যাপারী বলেন, ‘আমি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দিইনি। বলেছি, চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করব না। এখন ভয়-আতঙ্কে আছি। কাজ বন্ধ।’
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি, জমি ও স্থাপনা দখল, ভাঙচুরসহ নানা অপরাধের ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকায় পরিচিত এক কনটেন্ট নির্মাতার স্টুডিও এবং মিরপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপির কোনো কোনো নেতার নাম আসায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। কারণ, দলটি এখন সরকার পরিচালনা করছে।
‘চাঁদাবাজদের জন্য বাড়ি তুলতে পারছি না’
কেরানীগঞ্জের পর এবার ঢাকার মিরপুরের রূপনগরের চিত্র দেখা যাক।
রূপনগর এলাকায় চার কাঠার একটি প্লট কিনেছিলেন ব্যবসায়ী মোদাচ্ছের হোসেন। প্লটটির সঙ্গে আরেকজনকে অংশীদারও করেন তিনি। আশপাশের প্লটগুলোতে ভবন নির্মিত হলেও তার জমিটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে ছিল। চার মাস আগে সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের কাজ শুরু করতে যান তিনি। কিন্তু কাজ শুরুর পর থেকেই চাঁদার দাবিতে লোকজন আসতে থাকেন।
মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘একই গ্রুপের লোক, কিন্তু একেকবার একেকজন আসে। আমি চারটা পাইলিং শুরু করে দিয়েছিলাম। তারা হুমকি দিল, আগে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে সব মালামাল নিয়ে যাবে।’
চাঁদার দাবিতে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন তিনি। কবে আবার কাজ শুরু করতে পারবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছেন।
মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘আমি গ্রাম থেকে জায়গা-জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে এনেছি, বিল্ডিং বানাব, নিজের বাসায় উঠব। সেটা আর হলো না। এখনো ভাড়া বাসায় থাকি। চাঁদা দিয়ে কাজ করাতে পারব না।’
চাঁদার হুমকি পেলেও তিনি আইনের আশ্রয় নেননি। তাঁর ভাষায়, ‘লাভ হবে না। এখানে সবাই সব জানে। কিন্তু কেউ কিছু করবে না। চুপ থাকাই ভালো।’
রূপনগরে অর্ধশত প্লট ও ভবনে চাঁদার হুমকি
মোদাচ্ছের হোসেনের সূত্র ধরে রূপনগরের আশপাশের কয়েকজন প্লটমালিকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের অভিযোগ, চাঁদা না দিয়ে এলাকায় ভবন নির্মাণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকায় একটি ভবন নির্মাণের কাজ নিয়েছে ডেফোডিল হোমস কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, ১০ তলা ভবনের চারটি তলার নির্মাণকাজ শেষ হলেও এরপর আর কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি তিনি।
আবদুল মান্নান বলেন, ‘এখানে মাটি কাটার সময় থেকেই চাঁদা দাবি শুরু হয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে অনেকবার বসেছি। কিন্তু তারা একেকবার একেকজন আসে। পরে আর চাঁদা দিইনি। এরপর তারা আমার লোকজনকে কয়েকবার মারধর করেছে। তাদের টাকা দিলে আমাকে কাজ করতে দেবে, আর ঝামেলা করবে না।’
তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। হুমকির কারণে অন্তত চারবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। সর্বশেষ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে তাঁর।
আবদুল মান্নান বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হবে। তা না হলে প্রতি মাসে জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু এখন তিন বছরে কাজ শেষ করা অসম্ভব।’
এ ঘটনায় মামলা করেছেন তিনি। তবে মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।
আবদুল মান্নান বলেন, ‘মামলা একটা করেছি। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। থানা যদি তাদের সহযোগিতা না করে, তাহলে এক মাসের মধ্যেই এসব কমে যাবে। দলীয় লোকজন সহযোগিতা না করলেও এসব থাকবে না। আসলে তারা থানা ও দলীয় লোকজনের সহযোগিতা পায়।’
সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকায় আবদুল মান্নানের মতো আরও অনেক প্লট ও ভবনমালিক চাঁদার হুমকি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে গত রোববার সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকা প্লট/ফ্ল্যাট/বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির ব্যানারে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এলাকায় জমি দখলের পাশাপাশি নতুন করে প্লটমালিকদের কাছ থেকে স্থাপনা নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে দলবল নিয়ে নির্মাণশ্রমিকদের হুমকি ও মারধর করা হচ্ছে। এতে কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, রূপনগর থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এলেও পুলিশের উপস্থিতিতে সন্ত্রাসীরা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। থানা-পুলিশ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সমিতির সহসভাপতি মো. তাওহীদুল ইসলাম তালুকদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর থেকে এটা দেখা যাচ্ছে। ইদানীং চাঁদাবাজি ও দখল আরও বেড়েছে। প্লট মিলিয়ে প্রায় ৫০টি ভবনে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ঢাকায় চাঁদা দাবি, সন্ত্রাস ও দখলের ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ নাকচ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিই। যেখানে অপরাধ ঘটে, সেখানে তদন্ত করে মামলা নেওয়ার প্রয়োজন হলে মামলা করি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনি।’
চাঁদাবাজি-দখলের পেছনে রাজনৈতিক প্রশ্রয়?
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি, দখল ও ভাঙচুরের বিভিন্ন ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের কারও কারও নাম সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কি এসব অপরাধ দমনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেগুলো সহজে নির্মূল করা যায় না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা ক্ষমতায় এলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, বিরোধী দলে থাকার সময় যেসব হামলা-মামলা ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ক্ষমতায় এসে সেগুলো সুদে-আসলে তুলে নেবেন। আইন মেনে সেটা সম্ভব নয়। তখনই শক্তি প্রয়োগ করে অন্যের সম্পদ দখল বা চাঁদাবাজির কৌশল আসে।’
চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগে দলীয় নেতাদের নাম প্রকাশ্যে আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। তবে তৌহিদুল হকের মতে, এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক ব্যবস্থা সমঝোতামূলক কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারছে না। আইনের প্রয়োগও কঠোর করা দরকার। প্রতিটি ঘটনায় যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ করা হলে তা একটি বার্তা দেবে।’
তাহলে সরকার কি দল-সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে? আর চাঁদাবাজি ও দখল থামাতে সরকার কেন পারছে না?
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্বীকার করেছেন, সরকারি দলের কেউ কেউ অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন। তবে সরকার এসব অপরাধে প্রশ্রয় দিচ্ছে—এ অভিযোগ নাকচ করেছেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে না, প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো কারণও নেই। তবে সরকারি দলের কেউ না কেউ এর সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নন—এ অভিযোগও আমি উড়িয়ে দিতে চাই না। জনগণ যদি ক্রমাগত ভোগান্তির শিকার হতে থাকে এবং সেটা সরকারি দলের নামে হয়, আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সরকারকেই এর মাশুল দিতে হবে। সরকার এ বিষয়ে সচেতন আছে।’