বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) বেপরোয়া দুর্নীতিবাজ প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাবান। মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে হাতেনাতে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তার দুর্নীতির প্রবণতা কমেনি।
বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে বলা যায়। এমনকি এই বিএনপি আমলেও একের পর এক নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তাকে ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি পদ ছাড়েননি।
প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব হস্তান্তর না করে ছুটির দরখাস্ত দিয়েছেন। ছুটির দরখাস্ত অনুমোদন না হওয়া সত্ত্বেও, এমনকি দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশেরও তিনি তোয়াক্কা করছেন না।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষি উন্নয়ন ও ভূ-উপরিস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত প্রায় সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের আওতায় দায়সারা কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি চক্র।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। তথ্য সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সেচ প্রকল্পের প্রায় ২৫০টি কাজের শত কোটি টাকার দরপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মে জড়িত রয়েছেন। এছাড়া, কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ২১ সেপ্টেম্বর উপসচিব মো. মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক আদেশে ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদ থেকে মো. নুরুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে, অপসারণের আদেশ জারির পরও তিনি কার্যালয়ে এসে আগের আহ্বান করা দরপত্রের কাজ তদারকি করেছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর ঘোষিত প্রায় ২৫০টি নির্মাণকাজের বিপরীতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেলেও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় খাল খনন, কালভার্ট নির্মাণ, পুকুর ও জলাশয় তৈরি, গাড়ি ভাড়া, কম্পিউটারসহ নানা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্টরা আবেদন জানিয়েছেন।
আওয়ামী আমলে দুর্নীতি-লুটপাট
নুরুল ইসলাম ২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে মাত্র চার মাসের মাথায় একই বছরের ২০ জুন দুর্নীতির দায়ে অপসারিত হন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে কাজ দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালক নিজেই প্রকল্পে গাড়ি সরবরাহ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর তাকে হবিগঞ্জ অঞ্চলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তবে সেখানেও অনিয়মে জড়ান নুরুল ইসলাম। হবিগঞ্জ অফিস ভবনের কাজ চলমান ছিল। সেখানে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের কাজ করেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের নজরে এলে পুরো কাজটি খতিয়ে দেখা হয়। তিনি যেখানেই বদলি হন, সেখানেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
জানা যায়, হবিগঞ্জ অফিস ভবনের নির্মাণ কাজের অনিয়ম নিয়ে বিএডিসির অভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত হয়। তদন্তে ভবন নির্মাণে ৩৬টি খাতে অনিয়ম ধরা পড়ে। তদন্ত বলা হয়েছে, পুরো ভবনের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ শেষ হতে না হতেই ফাটল ও প্লাস্টার খসে পড়ছে। বাইরে লাগানো সিরামিক খসে পড়ছে। অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নিম্নমানের রং লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া নিম্নমানের ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবহার করা হয়েছে ভবনে। অনেক কাজ সমাপ্ত না করেই খাতা-কলমে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ডা. আব্দুর রাজ্জাকের সহায়তায় নুরুল ইসলাম রক্ষা পান।
তারপর নুরুল ইসলাম ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চট্টগ্রামে বদলি নেন। চট্টগ্রামে যাওয়ার পর সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাসিরের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন নুরুল ইসলাম। প্রতিটি কাজে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে ঠিকাদারদের কাজ দিতেন। পাইপ ক্রয়ের টেন্ডারের জন্য নিতেন ১৫ শতাংশ কমিশন। পাইপ ক্রয়ে অভিজ্ঞতাবিহীন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতেন। এর মধ্যে চট্রগ্রামে এন. এম প্লাস্টিক কোম্পানিটি এস আলম গ্রুপের মালিকের এক আত্মীয়। এন. এম প্লাস্টিক কোম্পানির সিইও আসাদুজ্জামান মাসুদকে দিয়ে নুরুল ইসলাম তার সকল সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, লুটপাট এবং ঠিকাদারকে ভয়-ভীতি ও হুমকি দিয়ে নিজের সুবিধা বুঝে নিতেন। তিনি এন. এম প্লাস্টিক কোম্পানিকে এক তরফাভাবে কাজ দিতেন।
শীর্ষনিউজ