Image description

২০২৪ সালের সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত এ প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগের পর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের পলাতক নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দেশে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। তবে শেখ হাসিনাকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ‍অনুষ্ঠানে তাকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। ভার্চুয়াল বক্তব্যেও তার চেহারা কোথাও দেখা যায়নি।

তবে অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিভিন্ন পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে ‘শেখ হাসিনাকে দেখা গেছে’ দাবি করে বিভিন্ন সময় সামাজিকযোগযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়েছেন আওয়ামীপন্থীরা। এসব দাবি ছড়ানোর পর বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান সেগুলোকে পুরোনো বলে প্রমাণ করেছে।

ছয়টি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান (রিউমর স্ক্যানার, বুম বাংলা, ফ্যাক্টওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, এএফপি ও দ্য ডিসেন্ট) এর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেখ হাসিনার পুরোনো ও সম্পাদিত ছবি ছড়িয়ে এককভাবে ৭৯ বার প্রকাশ্যে আসার দাবি করা হয়েছে। 

এছাড়া কখনো ভারতে প্রকাশ্যে দেখা গেছে, কখনো দেশে ফিরেছেন, গাড়িবহর নিয়ে ঘুরছেন, সীমান্তে এসেছেন, প্রকাশ্য কিংবা গোপনে বৈঠক করেছেন, কখনো লাইভে বা ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন, আন্তজার্তিক বিভিন্ন সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন নতুবা বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন– এমন দাবিই ছড়িয়েছে বারবার। 

তবে মূল দাবি একটাই– শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। এসব দাবি যেসব একাউন্ট ও পেইজ থেকে ছড়ানো হয়েছে তার অধিকাংশই নিয়মিত আওয়ামীলীগের পক্ষে পোস্ট করতে দেখা যায়।

 

সরাসরি ভারতে দেখা যাওয়ার দাবি অন্তত ৩৬ বার

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালানোর পর ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। ফলে তাকে ভারতে দেখা যাওয়ার দাবিই ছড়িয়েছে বেশি। 

ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, শেখ হাসিনাকে ভারতে দেখা যাওয়ার দাবি করা হয়েছে অন্তত ৩৬ বার। এর মধ্যে শুধু দিল্লিতে দেখা যাওয়ার দাবি করা হয়েছে ৮ বার। 

আর ৫ বার দাবি করা হয়েছে, ভারতে, গাড়িবহর নিয়ে ঘুরছেন তিনি। পুরোনো ভিডিওর মাধ্যমে, বেনাপোল থেকেও ঘুরে গেছেন একবার।

 

গাড়িবহর নিয়ে ঘোরার দাবি অন্তত ৫ বার

ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাই করা তথ্য মতে,  শেখ হাসিনা ভারতে গাড়িবহর নিয়ে ঘোরার দাবি ছড়িয়েছে অন্তত ৫ বার। এসব ভিডিও কোনোটি বাংলাশের, কোনোটি ভারতের, কোনোটি স্কটল্যান্ডের। আবার কোনোটি নেপালের। এসবের কোনোটিই শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনগুলো দেখুন– ১, ২, ৩, ৪, ৫।

 

ছবি-ভিডিও ছড়িয়েছে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতেরও

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দেশছেড়ে পালানোর পর থেকেই শেখ হাসিনার বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের একাধিক ভিডিও পুরোনো বলে শনাক্ত করেছে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলো। এসবের মধ্যে রয়েছে ডোনাল ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার সাক্ষাতের ভিডিও। 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কাতারের আমির, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পুরোনো ছবি ছড়িয়েছিল। 

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড ও ভারতের তামিলনাড়ুর নবম থালাপাতি বিজয় ও পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধীকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের সম্পাদিত ছবি ছড়ানো হয়েছিল।

এদিকে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে শেখ হাসিনাকে নিউইয়র্ক, দুবাই ও দিল্লিতে নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবিতে পুরোনো ভিডিও ছড়ানো হয়।

 

ছড়িয়েছে স্বশরীরে লাইভ ভিডিও কিংবা সাক্ষাৎকারের দাবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য শেখ হাসিনার নামে ‘লাইভ’ কিংবা সাক্ষাৎকার দাবিতে ছড়ানো হয়েছে বিভিন্ন ভিডিও।

বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে অন্তত ৫ বার প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাতকারের দাবি ছড়ানো হয়েছে। 

২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতে বসে সাক্ষাৎকারের দাবিতে ২০০৭ সালের ভিডিও ছড়িয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আরও ৪ বার সাক্ষাৎকার এবং অন্তত ৬ বার শেখ হাসিনা লাইভে এসেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। 

এ ধরনের কনটেন্টে ‘লাইভ’, ‘সাম্প্রতিক’, ‘এইমাত্র’ কিংবা ‘আজ’ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়।

তবে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ হলেও কোথাও তাকে লাইভে দেখা যায়নি।

 

ভিডিও কলে কথা বলেছেন তারেক রহমানের সঙ্গেও!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বলে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি সম্পাদিত। অন্যদিকে গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনা লাইভে মুখোমুখি বলে একটি সম্পাদিত ভিডিও ছড়ানো হয়। 

 

প্রচার করা হয় পুরোনো এবং অন্য দেশের ভিডিও

শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখানোর এই প্রচারে শুধু তার পুরোনো ভিডিও নয়, অন্য দেশ ও অন্য ব্যক্তিদের ভিডিওও ব্যবহার করা হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের একটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাক্ষাতের দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে পাকিস্তানের আরেকটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার দৃশ্য বলে ছড়ানো হয়।

২০২৬ সালের মার্চে একটি ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, যেটিকে ভারতে শেখ হাসিনার গাড়িবহরের দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়েছিল। যাচাইয়ে দেখা যায়, সেটি আসলে স্কটল্যান্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের ভিডিও।

 

একই কৌশল, নতুন কনটেন্ট

একটি দাবি একবার ফ্যাক্টচেক হয়ে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও একই ধরনের দাবি প্রচার থেমে থাকেনি। একই কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে নতুনভাবে। মাঝেমধ্যে পাল্টে যায় দাবিও। 

কখনো ২০০৭ সালের ভিডিও, কখনো ২০১০ সালের ভিডিও, কখনো ২০১৯ সালের ভিডিও আবার কখনো ২০২২ বা ২০২৩ সালের ফুটেজকে সাম্প্রতিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগের ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে শুরু করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও এমন বহু দাবি যাচাই করে মিথ্যা প্রমাণ করে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলো।

এবছরের ৫ আগস্টেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ভার্চুয়ার অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিবেন বলে জোরেসোরে হাইপ তোলেন। পরে দেখা যায়, হাসিনা অডিও কনফারেন্সে কথা বলছেন।