ডিমান্ড চার্জ ও বাড়তি বিলের আতঙ্কে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে আস্থা পাচ্ছেন না গ্রাহক। বিভিন্ন জায়গায় মিটার স্থাপনে বাধা দিচ্ছেন তারা। এতে থমকে আছে সরকারের সাড়ে তিন লাখ স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জে ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া কাটা হয়। তবে কোনো মাসে রিচার্জ করা না হলে তা সমন্বয় করা হয় পরবর্তী রিচার্জে। প্রিপেইড মিটার ও পোস্টপেইড মিটার উভয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ-খরচ সমান।
প্রিপেইড মিটারে ব্যবহার করা বিদ্যুতের বিপরীতে রিচার্জ করা এনার্জির ওপর সরকার প্রণোদনা হিসেবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট (ছাড়) দেয়। প্রিপেইড মিটার সংযোগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জামানত লাগে না। পোস্টপেইড মিটারের মতো প্রিপেইড মিটারের অনুমোদিত লোডের বিপরীতে ডিমান্ড চার্জ কিলোওয়াট প্রতি মাসে ৪২ টাকা হারে (আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে) ও ভ্যাট ৫ শতাংশ নিয়ম অনুসারে কাটা হয়। সেই হিসেবে দুই কিলোওয়াট ব্যবহার হলে ৮৪ টাকা ডিমান্ড কাটা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) বাস্তবায়নাধীন ‘ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় আট লাখ পঞ্চাশ হাজার স্মার্ট প্রিপেমেন্ট মিটার স্থাপন (বিশেষ সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটি ঝুঁকিতে পড়েছে। ডিপিডিসির প্রায় সব এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন গ্রাহক।
নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ‘নাগরিক অধিকার ফোরাম’, ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’ ইত্যাদি ব্যানারে একটি দল গত ২২ জুলাই ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলীর (দক্ষিণ) দপ্তরে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের বিরোধিতা করে স্মারকলিপি দেয়। ফলে ওই এলাকায় মিটার স্থাপনের কাজ আপাতত স্থগিত।
এ ধরনের গ্রাহক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আগামী চার মাসের মধ্যে অবশিষ্ট সাড়ে তিন লাখ স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি প্রকল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিপিডিসির জন্য।
ডিপিডিসি জানায়, নানা কারণে প্রিপেইড স্মার্ট মিটার স্থাপন কাজে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই অপপ্রচারকারীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করছে, মসজিদে প্রিপেইড মিটার সম্পর্কিত নানা ধরনের অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ফলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে দেশে সাড়ে তিন লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রকল্প। যে কারণে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮৭১ কোটি টাকা। ১ জুলাই ২০১৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ ছিল। তবে প্রস্তাবিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সমাপ্ত হবে কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে ডিপিডিসি।
প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্নের জন্য এরই মধ্যে মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। কারণ গ্রাহকদের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে মিটার স্থাপন কাজ।
অপপ্রচারে বিভ্রান্ত গ্রাহক: ডিপিডিসি
ডিপিডিসি জানায়, স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের বিভিন্ন সুবিধাদি সম্পর্কে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গ্রাহককে অবহিত করে প্রেস রিলিজ দেওয়া, ডিপিডিসির ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। প্রিপেইড মিটারের ব্যবহারবিধি সম্পর্কিত লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত। তারপরও থেমে নেই প্রিপেইড মিটারের বিষয়ে অপপ্রচার।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ডিমান্ড চার্জ ও বাড়তি বিল হতে পারে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব কারণে প্রিপেইড মিটার স্থাপন কাজ বন্ধ। ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা। এছাড়া বাড়তি বিল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তারপরও অপপ্রচার থেমে নেই।-প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন
প্রিপেইড মিটার স্থাপনে বাধা দেওয়া প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রিপেইড মিটার নিয়ে অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ডিমান্ড চার্জ ও বাড়তি বিল হতে পারে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব কারণে প্রিপেইড মিটার স্থাপন কাজ বন্ধ। ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা। এছাড়া বাড়তি বিল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তারপরও অপপ্রচার থেমে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ এলাকায় একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে প্রিপেইড মিটার স্থাপনে বাধা দেওয়ার জন্য। সবাইকে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি।’
কয়েক মাস ধরে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহক। প্রিপেইড-পোস্টপেইড সব গ্রাহকই ক্ষুব্ধ। এর মধ্যে পোস্টপেইড মিটারে অনেকে পেয়েছেন ভূতুড়ে বিল, যা সংশোধন করতে গিয়ে গলদঘর্ম গ্রাহক। মাগুরার একটি ঘটনায় ফোন করে দুঃখ প্রকাশও করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সব মিলিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রিপেইড মিটার স্থাপনে। তবে প্রিপেইড মিটারের সঙ্গে অন্য কোনো মিটার মেলানো যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ডিপিডিসি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ঝামেলা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বিল নিয়ে কিছু ঝামেলা ছিল। বিলগুলো ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। প্রিপেইড মিটার ২০১৩ সাল থেকে নেওয়া প্রকল্প। তবে নতুন করে কিছু অপপ্রচার চলছে। আমি বলছি এটা টেকনোলজি প্রুভেন। এটা অনেক অ্যাডভান্স লেভেলের। প্রিপেইড মিটারে ভূতুড়ে বিল ওঠার কোনো সুযোগ নেই।-ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী (উত্তর) মোহাম্মদ তারিকুল হক
ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী (উত্তর) মোহাম্মদ তারিকুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে ঝামেলা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বিল নিয়ে কিছু ঝামেলা ছিল। বিলগুলো ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। প্রিপেইড মিটার ২০১৩ সাল থেকে নেওয়া প্রকল্প। তবে নতুন করে কিছু অপপ্রচার চলছে। আমি বলছি এটা টেকনোলজি প্রুভেন। এটা অনেক অ্যাডভান্স লেভেলের। প্রিপেইড মিটারে ভূতুড়ে বিল ওঠার কোনো সুযোগ নেই।’
প্রিপেইড মিটার স্থাপনের মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ
প্যাকেজ-১ চুক্তির আওতায় দুই লাখ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ড ও ৬৫টি ডাটা কালেক্টর ইউনিট ছাড়া প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ছয় লাখ মিটারসহ আনুষঙ্গিক সব মালামাল আমদানি করা হয়েছে। মালামাল ঠিকাদারের কারখানায় প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। ফলে সবশেষ অনুমোদিত বিশেষ সংশোধিত ডিপিপিতে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকায় দুই লাখ মিটারের মালামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি।
এই সময়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব নয়। সবশেষ অনুমোদিত বিশেষ সংশোধিত ডিপিপির ‘সম্মানী’ খাতে মোট বরাদ্দ ১৫ লাখ টাকা, জুন-২০২৬ পর্যন্ত খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ লাখ টাকা।
প্রকল্পের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘সম্মানী’ খাত থেকে চার লাখ টাকা কমছে। প্রকল্পের প্যাকেজ-১ চুক্তির কার্য সম্পন্নের পর দুই বছরের অপারেশনাল সাপোর্ট সার্ভিস বাবদ বরাদ্দ ১৩ কোটি টাকা। চুক্তি মোতাবেক প্রকল্প চলাকালীন এই ব্যয় হবে না।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পরও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, ডিপিপির বরাদ্দ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রকল্প শেষে ডিপিডিসির নিজস্ব তহবিল থেকে এই ব্যয় নির্বাহ করা হবে। এসব কাজের জন্যও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনলাইন/মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ ও পরিশোধের ব্যবস্থা। গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি যথাসময়ে শতভাগ বিদ্যুৎ বিল (রাজস্ব) আদায় নিশ্চিতকরণ, ডিমান্ড সাইড লোড ম্যানেজমেন্ট ও সিস্টেম লস কমানো, ডিপিডিসি এলাকায় গ্রাহক প্রান্তে স্মার্ট প্রিপেমেন্ট মিটার স্থাপন ও ডিপিডিসি এলাকায় অ্যাডভান্স মিটারিং ইনফ্রাস্টাক্চার সম্বলিত মিটারিং ব্যবস্থা স্থাপন।
এছাড়া ১৭টি ইউটিলিটি কাস্টমাইজেশন সেন্টার স্থাপন, ডিপিডিসি এলাকায় স্মার্ট মিটারিং সিস্টেমের জন্য যুগোপযোগী নেটওয়ার্ক স্থাপন ও মিটার ডাটা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার স্থাপনের পাশাপাশি ডাটা সেন্টার ও ডাটা রিকভারি সেন্টার স্থাপন।