Image description

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্স-এ ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অপতথ্য শনাক্ত করবে পুলিশ। প্রয়োজন হলে দেবে পাল্টা বক্তব্য। এআই ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিতে বিশ্লেষণ করা হবে ভিডিও ফুটেজ। ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনলাইন প্রতারণা ও ডিজিটাল আর্থিক অপরাধও থাকবে নজরদারিতে। এসব কাজ পরিচালনায় সদর দফতর থেকে দেশের প্রতিটি থানা পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিট। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার জনবল, ২ হাজারের বেশি যানবাহনের চাহিদা এবং প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই ইউনিটকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন আছে, চ্যালেঞ্জও আছে।

সাইবার অপরাধের দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতায় এমন বিশেষায়িত ইউনিটকে সময়োপযোগী বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একইসঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যে, নজরদারি ও তদন্তের এত বিস্তৃত ক্ষমতার সঙ্গে স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা না থাকলে, অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কোন তথ্য ‘অপতথ্য’, কোন বক্তব্য ‘উসকানিমূলক’ এবং কোন পরিস্থিতিতে কাউন্টার ন্যারেটিভ দেওয়া হবে, এসবের স্বচ্ছ মানদণ্ডের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে দক্ষ তদন্তকারী, ফরেনসিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি।

তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, ‘ফ্যাক্ট চেক’ ও ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ তৈরির মতো ক্ষমতা কোন আইনি মানদণ্ডে প্রয়োগ হবে; সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অপতথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বৈধ মতপ্রকাশ যেন নজরদারির লক্ষ্য না হয়, সেজন্য কতটা স্পষ্ট থাকবে অনুমোদন, কার্যপদ্ধতি ও জবাবদিহিকে স্পষ্ট করতে হবে। আর এখানেই নতুন ইউনিটটির সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয়টি রয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ওইদিন তিনি জানান, কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর ইউনিটটির সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ইউনিটটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সদর দফতর থাকবে ঢাকায়। বিভাগীয় পর্যায়ে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপাররা (এসপি) সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যাবে থানা পর্যায়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি থানায় পর্যায়ক্রমে চালু হবে ‘সাইবার ডেস্ক’। প্রতিটি ডেস্কে দুই থেকে তিনজন প্রশিক্ষিত সাইবার তদন্ত কর্মকর্তা এবং দুই থেকে তিনজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) দায়িত্ব পালন করবেন। সাইবার অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক সাড়া দেওয়া ও তদন্তের দায়িত্ব থাকবে তাদের ওপর।

মহানগর, বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও পৃথক বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট থাকবে। অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোয় মোট পদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৯২। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৬৩টি পুলিশ সদস্যদের জন্য। বেসামরিক কারিগরি কর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে ১২৫টি এবং অন্যান্য বেসামরিক পদ ১০৪টি।

নতুন ইউনিটের আলোচিত দায়িত্বগুলোর একটি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ। সাংগঠনিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া গুজব, অপতথ্য, উসকানিমূলক প্রচারণা এবং সম্ভাব্য সাইবার হুমকি শনাক্ত করা হবে। ‘ফ্যাক্ট চেক ও কাউন্টার ন্যারেটিভ’ কার্যক্রমের আওতায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো যাচাইবিহীন তথ্য ও অপতথ্য পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক তথ্য তুলে ধরে পাল্টা বক্তব্য প্রচারের কথাও রয়েছে প্রস্তাবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি ওপেন সোর্স বা উন্মুক্ত উৎস থেকেও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে সংশ্লিষ্ট শাখা। কিন্তু কোন ধরনের তথ্যকে যাচাইয়ের জন্য বেছে নেওয়া হবে, ‘অপতথ্য’ বা ‘উসকানিমূলক’ প্রচারণা নির্ধারণের মানদণ্ড কী হবে এবং কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রচারের অনুমোদন প্রক্রিয়া কেমন হবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত মানদণ্ড এখনও জানানো হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত বদলে যাওয়ায় প্রচলিত পুলিশিং কাঠামোর বাইরে বিশেষায়িত সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজন ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই স্বচ্ছ কার্যপদ্ধতি বা এসওপি জরুরি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও অপতথ্য মোকাবিলার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সাইবার পুলিশিং যেন বৈধ মতপ্রকাশ পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত সাইবার অপরাধের তদন্তে কেন্দ্রীভূত থাকে। এজন্য স্বচ্ছ এসওপি, যথাযথ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।’

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ এখন আর শুধু ফেসবুক আইডি হ্যাক, অনলাইন হয়রানি কিংবা সাধারণ প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আর্থিক জালিয়াতি, ফিশিং, ম্যালওয়্যার, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, ডার্ক ওয়েবভিত্তিক অপরাধ, পরিচয় চুরি, র‍্যানসমওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডিপফেক ও প্রতারণার মতো অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। তার মতে, এই বাস্তবতায় নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিট সময়োপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।’

নতুন ইউনিটে মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি ব্যবহার করে প্রতারণা এবং ফিশিংসহ প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক অপরাধের তদন্তে আলাদা সক্ষমতা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অনলাইন বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিসংক্রান্ত অপরাধ এবং ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের তদন্তেও পৃথক ইউনিট থাকবে। এর বাইরে থাকবে সাইবার টহল, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, হুমকি বিশ্লেষণ, এথিক্যাল হ্যাকিং এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা শনাক্ত করার কার্যক্রম

এআই দিয়ে ভিডিও ও মুখ শনাক্ত

সাংগঠনিক পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এআই প্রযুক্তি ও মুখ শনাক্তকরণ সফটওয়্যার ব্যবহার করে টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করার কথা রয়েছে। অপরাধ শনাক্ত ও তদন্তে এ ধরনের প্রযুক্তি সহায়ক হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি কেনা এবং সেটি নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন হবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের স্পষ্ট আইনি ভিত্তি, যথাযথ অনুমোদন এবং সংরক্ষিত তথ্যের নিরাপত্তা।

নতুন ইউনিটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টি সামনে আনছেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ‘৪ হাজার ৫৯২ জনের ইউনিট তৈরি করলেই ৪ হাজার ৫৯২ জন সাইবার ইনভেস্টিগেটর তৈরি হয় না। এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

তার মতে, সাইবার অপরাধের তদন্ত প্রচলিত অপরাধের তদন্তের মতো নয়। একজন দক্ষ তদন্তকারীকে আইপি লগ, ডিভাইস আর্টিফ্যাক্ট, ক্লাউডে থাকা প্রমাণ, মোবাইল ফরেনসিক, সিডিআর ও আইপিডিআর, ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনের গতিপথ, ম্যালওয়্যারের আচরণ, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা ওসিন্ট এবং মেটাডাটা বুঝতে হবে। একই সঙ্গে জানতে হবে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, ফরেনসিক ইমেজিং, হ্যাশ ভেরিফিকেশন এবং ‘চেইন অব কাস্টডি’ রক্ষার নিয়ম। কারণ ডিজিটাল প্রমাণ খুঁজে পাওয়া এবং সেই প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা দুটি আলাদা সক্ষমতা।

দেশব্যাপী সাইবার ডেস্ককে নতুন ইউনিটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অংশ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যে প্রতিটি থানাকে ক্ষুদ্র ফরেনসিক ল্যাব বানানোর চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘‘থানার সাইবার ডেস্কের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগ গ্রহণের পর দ্রুত ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণ করা। ডিজিটাল প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার আগেই ‘প্রিজারভেশন রিকোয়েস্ট’ পাঠানো, আক্রান্ত ডিভাইস সঠিক নিয়মে জব্দ করা এবং জটিল ঘটনা বিশেষায়িত ইউনিটে পাঠানো।’’

একটি কার্যকর সাইবার তদন্তের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘অভিযোগ, প্রমাণ সংরক্ষণ, অপরাধী শনাক্তকরণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ,  আর্থিক লেনদেন অনুসরণ, গ্রেফতার, ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপন, বিচার কার্যক্রম এবং দণ্ড নিশ্চিতকরণ।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই ধারাবাহিকতার যেকোনও একটি ধাপ দুর্বল হলে বড় প্রযুক্তি বা বিপুল জনবল দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।’’

সাইবার তদন্তে প্রচলিত মামলার মতো দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ সবসময় থাকে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, আইপি লগ, প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ক্লাউড আর্টিফ্যাক্ট কিংবা ডিজিটাল লেনদেনের অনেক তথ্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর মুছে যেতে পারে।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর চিঠি পাঠানোর সংস্কৃতি দিয়ে আধুনিক সাইবার অপরাধ তদন্ত সম্ভব নয়।’ তিনি মনে করেন, ২৪ ঘণ্টার প্রমাণ সংরক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস, ব্যাংক, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে নির্ধারিত জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

ডিকোডস ল্যাব লিমিটেডের সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে যে হারে সাইবার অপরাধ বাড়ছে, সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠন প্রয়োজন ছিল।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে ইউনিটটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত, আন্তসংস্থা সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।’’

তিনি বলেন, ‘‘শুধু একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে বসালেই চলবে না। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও নতুন কৌশল ব্যবহার করায় পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ধরনের সাইবার জালিয়াতির কৌশল নিয়ে গবেষণা করার সক্ষমতাও থাকতে হবে, যাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত করা যায়।’’

আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম থাকার পরও জেলা ও থানা পর্যায়ে দক্ষ তদন্তকারী এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ না থাকলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।’

বিশেষ করে আদালতে উপস্থাপনের উপযুক্ত ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ এবং ‘চেইন অব কাস্টডি’ অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের জ্ঞান না থাকলে ইউনিটের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

তানভীর হাসান জোহাও একই ধরনের একটি দুর্বলতার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘তদন্ত শেষে শত শত পৃষ্ঠার ফরেনসিক প্রতিবেদন তৈরি করাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। প্রসিকিউটরকে বুঝতে হবে কোন ডিজিটাল আর্টিফ্যাক্ট কোন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করছে। একইভাবে ফরেনসিক পরীক্ষককে আদালতে নিজের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা এবং সমর্থন করার সক্ষমতা থাকতে হবে।’ তাই বড় সাইবার অপরাধের মামলায় তদন্তকারী, ফরেনসিক পরীক্ষক ও প্রসিকিউটরের মধ্যে শুরু থেকেই সমন্বিত কৌশল থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

নতুন ইউনিটে সিস্টেম অ্যানালিস্ট, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষক, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষক, ডার্ক ওয়েব বিশ্লেষক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এসব বিশেষজ্ঞকে পৃথক বেতন কাঠামোয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। নতুন নিয়োগের আগে বিদ্যমান পুলিশ সদস্যদের মধ্য থেকে যত বেশি সম্ভব পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ পদের নাম সাংগঠনিক কাঠামোয় থাকাই যথেষ্ট নয়। দক্ষ ব্যক্তিদের ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার কাঠামো, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ প্রয়োজন।’

অপব্যবহারের ঝুঁকি

সাইবার পুলিশের ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনি সুরক্ষা বাড়ানোর প্রশ্নও তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘আইনের ধারা অস্পষ্ট থাকলে কিংবা আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, প্রমাণের মানদণ্ড, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও জবাবদিহির মধ্যে না থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার আশঙ্কা, থানা পর্যায়ে ডিজিটাল আইনকে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো বা ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হলে নিরপরাধ ব্যক্তিও হয়রানির শিকার হতে পারেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনও হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং সেখানে সাইবার অপরাধগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে।

থাকবে ২৪ ঘণ্টার সহায়তাকেন্দ্র

সরকারের পরিকল্পনায় একটি ২৪ ঘণ্টার সাইবার সহায়তাকেন্দ্র চালুর কথাও বলা হয়েছে। শর্ট কোড, কল সেন্টার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইমেইলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সেবা ও আইনি পরামর্শ দেওয়া হবে। কেন্দ্রটির হটলাইন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ভুক্তভোগীদের জন্য এই কেন্দ্র কার্যকর করা গেলে সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত অভিযোগ এবং প্রমাণ সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একজন ভুক্তভোগী কোথায় অভিযোগ করবেন বা ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কীভাবে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করবেন, সেটিই জানেন না।

সাংগঠনিক প্রস্তাবে পুলিশের নতুন এই ইউনিটের জন্য ২ হাজার ৬৭টি যানবাহনের চাহিদা দেখানো হয়েছে। বার্ষিক নিয়মিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৭ কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৩৪ টাকা। এককালীন অনিয়মিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯২ টাকা। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত ব্যয় ৪৪৭ কোটি ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৬ টাকা।