Image description

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য সংকটকে কেন্দ্র করে টানা ১৪ দিনের অচলাবস্থা নিরসন ও শিক্ষা কার্যক্রম সচল করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

এদিকে ক্লাস-পরীক্ষা ও ল্যাব বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের ‘সর্বাত্মক শাটডাউন’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন গড়িয়েছে মানববন্ধন, মশাল মিছিল, গণস্বাক্ষর, লাল কার্ড প্রদর্শন ও অবস্থান কর্মসূচিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি দেওয়া হয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। তবু ১৪তম দিনেও কাটেনি অচলাবস্থা।

ঘটনার শুরু ২১ সেপ্টেম্বর। এর মাত্র ৫৬ দিন আগে, ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আকস্মিক এই পরিবর্তনের প্রতিবাদে সেদিন রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় ‘সর্বাত্মক শাটডাউন’; বন্ধ হয়ে যায় ক্লাস, পরীক্ষা ও ল্যাবের কার্যক্রম।

 

এরপর আন্দোলন প্রতিদিনই নতুন কর্মসূচিতে গড়ায়। এরই মধ্যে ২৪ সেপ্টেম্বর, আন্দোলনের তৃতীয় দিনে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে খোলা চিঠি পাঠ করেন চুয়েটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তফা খালিদ বিন শামস আরিয়ান।

 
 

চিঠিতে শিক্ষার্থীরা জানান, ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় তাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ইন্টার্নশিপ, বৃত্তির আবেদন, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি ও চাকরির পরিকল্পনাতেও।

 

প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া ওই চিঠিতে শিক্ষার্থীরা জানান, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের ব্যক্তি বা যোগ্যতা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। তাদের আপত্তি উপাচার্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে। অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষা, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের সুযোগ তৈরিতে যেসব উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, সেগুলো হঠাৎ থেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও চিঠিতে তুলে ধরা হয়। দ্রুত সংকটের সমাধান করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল এবং ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষা চালুর সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের এই দাবির দিনেই নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বিকেল ৪টার দিকে অনলাইনে যোগ দেন।

তিনি জানান, সচিবের মাধ্যমে তার যোগদান সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতির সমাধানের কথাও বলেন তিনি। তবে তার যোগদানের পরও শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যান। ওই রাতে তারা মশাল মিছিল করেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন।

অচলাবস্থার মধ্যে আন্দোলনের পক্ষে দেশের বাইর থেকেও সমর্থন আসে। ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন অধ্যাপকের লিখিত সমর্থনের কথা জানানো হয়। তাদের চিঠিতে অধ্যাপক সায়েমের সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন উটাহ ইউনিভার্সিটির ড. মো. আবদুস সালাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আলাদা চিঠি দিয়ে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের আহ্বান জানান।

আন্দোলনের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একাডেমিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় তাদের শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের মাধ্যমে দ্রুত একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।

২ অক্টোবর, আন্দোলনের ১১তম দিনে, ছুটির দিনেও বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সেদিন তারা জানান, দাবি নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে এখনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় তারা হতাশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশার কথাও জানান তারা।

পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয় ৩ অক্টোবর। নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের চারটি পরীক্ষা আন্দোলনের কারণে আটকে থাকার কথা বলেছিলেন।

শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করে জানান, ওই শিক্ষাবর্ষের প্রায় সব বিভাগের পরীক্ষা শেষ হয়েছে; শুধু একটি বিভাগের পরীক্ষা শুরু হওয়ার বাকি ছিল। তাদের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে বক্তব্য দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

সেদিন দুপুর আড়াইটার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে আবার শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ‘তোমার ভিসি, আমার ভিসি সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’ এবং ‘এক দফা, এক দাবি সায়েম স্যারকে ভিসি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন

ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হিশাম বলেন, প্রশাসনের নীরবতায় তারা ক্ষুব্ধ। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় দ্রুত সমস্যার সমাধান করে তাদের ক্লাসে ফেরার পরিবেশ তৈরিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তারা।

অন্যদিকে, সংকট সমাধানে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিরাও সরকারের দ্বারস্থ হন। ৪ অক্টোবর চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতির প্রতিনিধিরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি এবং অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরা হয়।

শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক মো. সামিউন বাসির জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন। দ্রুত একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চুয়েটের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশা করছেন তারা।

তবে বৈঠকের পরও কাটেনি অচলাবস্থা। ৫ অক্টোবর, আন্দোলনের ১৪তম দিনে, চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের শাটডাউনের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতিও অব্যাহত থাকে। এদিন উপাচার্য ভবনের সামনে থেকে র‍্যালি বের করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতির সদস্যরা। র‍্যালিটি স্বাধীনতা চত্বর হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আন্দোলনের শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছাও জানানো হয়।

মানববন্ধনে চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা কর্মসূচি পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আর বিলম্বিত না করে দ্রুত দাবি মেনে তাদের ক্লাসে ফেরার সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষার্থীরাও বলেন, শিক্ষক দিবসেও তাদের শ্রেণিকক্ষে থাকার বদলে রাজপথে থাকতে হচ্ছে; দ্রুত সংকটের সমাধান চান তারা।

চুয়েটের এই অচলাবস্থায় এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ৫ অক্টোবর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ অচলাবস্থায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ক্যাব বলেছে, চুয়েটের মতো গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। সংগঠনটি সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সংকটের সমাধান চেয়েছে।

ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, মহানগর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম জাহাঙ্গীর ও যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফ নোমান বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

বিবৃতিতে ক্যাবের নেতারা বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা ও পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। দীর্ঘদিন একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।