গতকাল থেকে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখি, বাংলাদেশের কতগুলো জেলা ঘুরেছেন, তার একটা ম্যাপ বানিয়ে শেয়ার করছেন অনেকে। কেউ ১০ জেলা ঘুরেছেন, কেউ ৩০টি। আবার কারও ম্যাপে দেখা যাচ্ছে ৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষ। ফেসবুকে এত মানুষের আগ্রহ দেখে আমারও বেশ কৌতূহল হলো। কীভাবে এই হিসাব বের করা যায়, তা নিয়ে একটু খোঁজাখুঁজি করলাম। পেয়ে গেলাম ‘আনসিন বাংলাদেশ’ নামের ওয়েবসাইট।
ওয়েবসাইটের একেবারে নিচের দিকে, মানে ফুটারে লেখা, ‘বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা দিয়ে তৈরি’। পাশেই ইংরেজিতে লেখা–মেইড বাই সাব্বির হোসেন।
ফেসবুকে খুঁজে পেলাম সাব্বিরকে। আলাপে জানা গেল, তাঁর পুরো নাম সাব্বির হোসেন রবিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমানে কাজ করছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। সফটওয়্যার ও মোবাইল অ্যাপের ডিজাইন নিয়ে কাজ করেন, আছে নিজের এজেন্সিও।
কিন্তু আনসিন বাংলাদেশের গল্পটা কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দিয়ে শুরু হয়নি। নিজের প্রয়োজন মেটাতে তৈরি করা এই প্লাটফর্মই যে রাতারাতি দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, তা ভাবেননি সাব্বির নিজেও।
‘নিজের সুবিধার জন্য বানানো’ প্লাটফর্ম ছড়িয়ে পড়ল মানুষের কাছে
সাব্বির হোসেন রবিনের জন্ম নোয়াখালীতে। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা সবই চট্টগ্রামে। পাহাড়ের কোলঘেঁষে বেড়ে ওঠা সাব্বির ছোট থেকেই ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। চট্টগ্রামের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি এর পেছনে কাজ করছে কিনা জানতে চাইলে সাব্বির হোসেন বলেন, ‘এভাবে কখনও ভেবে দেখিনি। সবসময়ই ঘুরতে পছন্দ করতাম। তবে চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় খুব সুন্দর জায়গা, তাই এটিও আমার মনে প্রভাব ফেলতে পারে।’
নতুন কোনো জেলা ঘুরে আসার পর সাব্বির চাইতেন, বাংলাদেশের মানচিত্রে সেটি চিহ্নিত করতে। এতে সহজেই বোঝা যাবে, কতগুলো জেলা দেখা হয়েছে আর কতগুলো এখনো বাকি। কিন্তু প্রতিবার নতুন করে মানচিত্র তৈরি করা সহজ নয়। তাই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবলেন, যেখানে শুধু নতুন জেলা নির্বাচন করলেই মানচিত্র আপডেট হয়ে যাবে। এরপর সেটি ডাউনলোড করে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা যাবে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ জেলা ঘুরেছেন সাব্বির। তবে নতুন কোনো জেলায় যাওয়ার আগে অনেক তথ্যও যোগাড় করতে হয়। কোথা থেকে বাস বা ট্রেন পাওয়া যাবে, কোন পথে যাওয়া ভালো, কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে এসব জানতে কখনো গুগল, কখনো এআই, আবার কখনো পরিচিত মানুষের সাহায্য নিতে হয়।
বিশেষ করে একা ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন বলে নতুন জায়গায় যাওয়ার আগে এ ধরনের প্রস্তুতি তাঁর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বারবার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়াও বেশ ঝামেলার। নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে সাব্বির বুঝতে পারছিলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে অনেকেরই সুবিধা হবে। একই সঙ্গে তাঁর নিজেরও প্রয়োজন ছিল এমন মানচিত্র, যেখানে নতুন কোনো জেলা ঘুরে এলেই সেটি চিহ্নিত করে রাখা যাবে।
এই ভাবনা থেকেই প্রথমে নিজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেন ওয়েবসাইটটি। কাজটি করতে এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন তিনি। এই প্লাটফর্ম তৈরি হওয়ার পর কয়েকজন বন্ধুকে ওয়েবসাইটটি দেখান সাব্বির। বন্ধুরাই তাঁকে পরামর্শ দেন, অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার। এরপর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ওয়েবসাইটটির কথা জানান। তখনো কোনো বড় প্রচারণা ছিল না, ভ্রমণবিষয়ক গ্রুপগুলোতেও আলাদা করে পোস্ট করেননি। কিন্তু মানুষের আগ্রহের কারণে লিংকটি একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপেও মানুষ এটি শেয়ার করতে শুরু করেন।
মানুষের এই সাড়া তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। শুরুতে ওয়েবসাইটের জন্য আলাদা ডোমেইনও কেনেননি। বিনা মূল্যের ওয়েব ঠিকানায় চালু ছিল সাইটটি। কিন্তু এক রাতে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মানুষ ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করতে থাকেন। এতে হোস্টিংয়ের বিনা মূল্যের ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে নিজস্ব ডোমেইন যুক্ত করেন এবং হোস্টিংয়ের জন্য অর্থ খরচ করতে হয়।
ব্যবহারকারীদের চাহিদা থেকেই একে একে নতুন ফিচার যুক্ত করেছেন সাব্বির। কেউ বলেছেন, বাংলাদেশের মানচিত্রের পাশাপাশি বিশ্বের মানচিত্রও থাকলে ভালো হয়। তিনি সেটি যুক্ত করেছেন। মানুষ এই বিষয়ে এতটাই সাড়া দিয়েছেন যে বিভিন্ন জেলার কিছু দর্শনীয় স্থান বাদ পড়ে যাওয়ায় ব্যবহারকারীরা নিজেরাই তাঁকে ছবি ও তথ্য পাঠিয়ে সাহায্য করেছেন।
একজনের ব্যক্তিগত শখ কীভাবে অনেক মানুষের আগ্রহের সঙ্গে মিলে যেতে পারে, আনসিন বাংলাদেশের গল্প তারই উদাহরণ।
আনসিন বাংলাদেশে কী কী পাবেন?
আনসিন বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত ফিচার হলো বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ভ্রমণ-মানচিত্র। ব্যবহারকারী কোন কোন জেলা ঘুরেছেন, তা নির্বাচন করে নিজের ভ্রমণের হিসাব রাখতে পারেন। মানচিত্রটি ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ারও করা যায়। ফলে একজনের ভ্রমণ অন্যজনকে নতুন জায়গা ঘুরে দেখার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
তবে ওয়েবসাইটটি শুধু জেলা গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন জেলার দর্শনীয় স্থান, ভ্রমণের পরিকল্পনা এবং যাতায়াতসংক্রান্ত তথ্যও এখানে সাজানো হয়েছে। কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যায়।
ট্রিপ প্ল্যানার ফিচার দিয়ে ভ্রমণের সময়, গন্তব্য ও আনুমানিক বাজেট নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো যায়। রয়েছে বিশ্বের মানচিত্র, যেখানে দেশের বাইরের ভ্রমণের হিসাবও রাখা সম্ভব। এ ছাড়া কুইজ ও গেমসের মতো ফিচার ওয়েবসাইটটিকে আরও ইন্টারেক্টিভ করে তুলেছে।
সাব্বিরের লক্ষ্য, ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে মানুষকে যেন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে না হয়। আগে কোনো জায়গায় যাওয়ার কথা ভাবলে তথ্য সংগ্রহ করতে অনেক সময় ব্যয় হতো। এক জায়গায় প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। তবে যাত্রার আগে বাস বা ট্রেনের সময়, ভাড়া, হোটেল এবং অন্যান্য পরিবর্তনশীল তথ্য সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
দেশের পর্যটন নিয়ে যত আক্ষেপ
বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে কিছু আক্ষেপ রয়েছে সাব্বির হোসেনের। বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অনেকের কাছ থেকেই বাংলাদেশ ভ্রমণের আগ্রহের কথা শুনেছেন। কিন্তু তাঁরা যখন জানতে চান, বাংলাদেশে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়, তখন সব তথ্য এক জায়গায় দেখানোর মতো কোনো ভালো ওয়েবসাইট তাঁর হাতে থাকে না। অনেক সময় আলাদা করে ছবি পাঠিয়ে বা কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে জায়গাগুলোর কথা বলতে হয়।
ব্যাপারটি সাব্বিরের কাছে খুব পেশাদার মনে হয় না। তাঁর মতে, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটগুলোতে দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাবেন।
আনসিন বাংলাদেশকে সেই সম্ভাবনার ‘ছোট উদ্যোগ’ হিসেবে দেখেন সাব্বির হোসেন। তাঁর স্বপ্ন, ওয়েবসাইটটি একসময় পর্যটনসংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের নজরে আসবে। সেখান থেকে আরও বড় পরিসরে ভালো কিছু করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনে নিজের তৈরি প্ল্যাটফর্মটি বিনা মূল্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতেও আপত্তি নেই তাঁর। ব্যক্তিগতভাবে কৃতিত্ব পাওয়ার চেয়ে দেশের পর্যটন খাতের উন্নতি তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।