লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মাণ করা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে। বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই সেখানে না থেকে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা বসে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে মাদক ও নারী ব্যবসার অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি হিসাবে, রায়পুর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৪৬৭টি পরিবারকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৩টি ঘরে মানুষ বসবাস করছেন। বাকি ১৫২টি ঘরে ঝুলছে তালা। এসব ঘরের অনেক উপকারভোগী নিজেদের গ্রামের বাড়িতে থাকায় প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের নতুন করে ঘর দেওয়ার দাবি উঠেছে।
গতকাল সকালে রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজার, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের খলিফারহাট, মিয়ারহাট ও হাজিমারা এবং উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের মদিনাবাজার এলাকায় আশ্রয়ণ ও আবাসনকেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক ঘর তালাবদ্ধ। কোথাও ঘরের সামনে আগাছা ও ময়লা জমে আছে। কয়েকটি ঘরের টয়লেট ও পানির কল নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কল চুরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দাদের অনেকে বিশুদ্ধ পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, পুকুরের ঘাট ভাঙা এবং কবরস্থানের ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ করেছেন।
বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই সেখানে না থেকে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন
রায়পুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘরে কেউ বসবাস করছেন না। এসব ঘর পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
১৫২ ঘরে তালা
উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি ও শিবপুরে ১০টি, কেরোয়া ইউনিয়নের মীরগঞ্জ বাজারসংলগ্ন এলাকায় ৯টি, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের মিয়ারহাটে ৪৫টি, হাজিমারা এলাকায় ৪৪টি, কারিমিয়া এলাকায় ১১৭টি, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের কুচিয়ামারায় ২৪টি, মদিনাবাজারে ৪৩টি এবং দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নের উদমারা গ্রামে ৭৯টি ঘর রয়েছে।
এর মধ্যে বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৪০টি, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাটে ১৪টি ও হাজিমারা এলাকায় ১৪টি, উত্তর চরবংশীর মদিনাবাজারে ১৩টি ও কুচিয়ামারায় ৮টি, দক্ষিণ চর আবাবিলের উদমারায় ১১টি এবং কারিমিয়া এলাকায় ৩২টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে।
একই সঙ্গে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা বসে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ
বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পরিবর্তে কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্বচ্ছল ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেকে সেখানে না উঠে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করছেন।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের হাজিমারা ও মিয়ারহাটসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার সময় উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া ঘরের মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের কাজের জন্যও টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া ও স্থানীয় সমাজসেবক মনির হোসেন মোল্লা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের সময় অনিয়ম হয়েছে বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন। উপজেলা ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সন্ধ্যার পর কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে মাদকের আড্ডা বসে।
কোথাও কল চুরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে
অপ্রতুল বরাদ্দে নিম্নমানের কাজ
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর নির্মাণকাজ নিম্নমানের হয়েছিল। মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের জন্য উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা করে মেম্বারদের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। নিজেদের ঘর হওয়ায় অনেকেই বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমিকের কাজ করেছেন। ঘরের রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস ১ হাজার ২০০ টাকা করে নিয়েছিল।
পানির সংকট, নষ্ট টয়লেট
আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দারা জানান, অনেক এলাকায় গভীর নলকূপের পানি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কোথাও পুকুর থাকলেও ঘাট ভাঙা। কয়েকটি ঘরের পাশের পুকুরের পাড় ভেঙে ঘর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। টয়লেটগুলোর অনেকগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানির কল নষ্ট ও চুরি হয়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানি, কবরস্থান ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদি হাসান কাউছার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে। বরাদ্দের তালিকায় কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তি থাকলে তাকে বাদ দিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে। খুব শিগগির আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল হাই খান জানান, তার আগে প্রকৌশলী আশিকুর রহমান এসব ঘরের নির্মাণকাজ দেখভাল করেছেন।
সরকারি নকশা অনুযায়ী প্রতিটি আশ্রয়ণ ঘরের আয়তন প্রায় ৫০০ বর্গফুট। প্রতিটি ঘরে দুটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা রয়েছে। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘরে সোলার সিস্টেম ও বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থার কথা রয়েছে। প্রতিটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
