সারা দেশে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু শনাক্তকরণের কিট সংকট দেখা দেওয়ায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গু পরীক্ষা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের ১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৮২ জন রোগীর ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জনের ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। ৩৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হাসপাতালে আসা রোগীরা পরীক্ষা করতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন অন্য স্থানে। আবার কিট কবে এ হাসপাতালে আসবে, তা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মরত চিকিৎসকরা বলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমাদেরও পর্যাপ্ত কিট ছিল। সেখান থেকে কিছু কিট অন্য উপজেলায় ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে সংকট দেখা দিয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আবার কিটের মজুত হবে এবং ডেঙ্গু পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবে শুরু করা সম্ভব হবে।’
কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি জানান, যশোরের কেশবপুরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার সকালে মতলেব হোসেন নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। হাসপাতাল ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর পৌর শহরের বালিয়াডাঙ্গা এলাকার ব্যবসায়ী মতলেব হোসেন বুধবার বিকালে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কেশবপুর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে তিনি মারা যান।
চলতি বছর কেশবপুরে ১৭২ জন নারী ও পুরুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে মতলেব হোসেন মারা গেছেন। বর্তমানে বায়সা গ্রামের কাদেরের স্ত্রী আলেয়া, হিজলডাঙ্গা গ্রামের ইকরামুলের মেয়ে সাবিনা, মণিরামপুরের আব্দুল কাদেরের ছেলে মির্জা গালিবসহ তিনজন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে কেশবপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। অন্যরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসক এই প্রতিনিধিকে জানান।
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমার লক্ষণ নেই। বরং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জে নতুন করে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে জেলায় মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ জনে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১৪ জন। জেলা পর্যায়ের এই চিত্রের মধ্যে বাজিতপুরও রয়েছে উদ্বেগের তালিকায়। একই দিনের তথ্য অনুযায়ী, বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আজকে পর্যন্ত আটজন বেড়ে ১০৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. আলভী হাছান বলেন, বর্তমানে ১০৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়লে পর্যাপ্ত বেড, পরীক্ষার সুবিধা, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসক ও নার্সিং সেবার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।’
রাজস্থলী (রাঙামাটি) প্রতিনিধি জানান, রাজস্থলীতে গত এক মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য এই উপজেলাতেও ডেঙ্গুর এই হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে পুরো উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২০ জন। এর আগের মাস, এই সংখ্যা ছিল মাত্র সাতজন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশেরই স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে সাধারণ চিকিৎসার বাইরে থাকা কয়েকজন রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
এই বিষয়ে রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান জানান, গত কয়েক মাস ধরে সারা দেশের মতো রাজস্থলীতেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, রংপুরের পীরগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু । এতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেড়েছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে ১৩০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে নির্ধারিত শয্যার বাইরে হাসপাতালের ফ্লোর ও বারান্দাতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভর্তি ২৪ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৪ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী। আক্রান্তদের অধিকাংশই ঢাকা ফেরত। ঢাকায় অবস্থানকালে জ্বর অনুভব করে অনেকে নিজ বাড়ি পীরগঞ্জে ফিরে আসার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা করিয়ে ডেঙ্গু শনাক্ত করছেন। আবার কেউ কেউ বাড়িতে জ্বর অনুভব করার পর হাসপাতালে এসে রক্ত পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার তরিকুল ইসলাম বলেন, রংপুর জেলার মধ্যে পীরগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রভাব বেশি। বিগত বছরগুলোতে আমরা এত ডেঙ্গু রোগী পাইনি। বর্তমানে ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং তাদের চিকিৎসা চলমান রয়েছে।