Image description

প্রায় তিন মাস ধরে নিখোঁজ স্ত্রীকে খুঁজছিলেন আলী হোসেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, মাজার, হাসপাতাল, পথঘাট—কোথাও খোঁজা বাদ রাখেননি। একদিন ফেসবুকে একটি ভিডিওতে তাঁর চোখ আটকে যায়। এতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বসে মানুষের কাছে খাবার চাইছেন এক নারী। তাঁকে চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হয়নি আলী হোসেনের। ওই নারীই তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগম।

এরপর আর দেরি করেননি আলী হোসেন। ছুটে যান মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের গোবিন্দল এলাকায়। রাস্তার পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন আলী হোসেন। আনন্দে হু হু করে কেঁদে বুক ভাসান। অন্যদিকে স্বামী আলী হোসেনকেও চিনতে পারেন আলেয়া।

আলী হোসেন (৫৫) মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, আলী হোসেনের স্ত্রী আলেয়ার মানসিক সমস্যা আছে। প্রায় তিন মাস ধরে তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আলেয়াকে খুঁজে পান আলী হোসেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে আলেয়াকে বিয়ে করেন আলী হোসেন। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ঢাকার ধামরাই উপজেলার বালিয়া এলাকায়। প্রায় ছয় বছর আগে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন আলেয়া। পরে রাজধানীর একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন আলেয়া। প্রায় তিন বছর আগে অসুস্থ হয়ে ৯ দিন নিখোঁজ ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁকে খুঁজে পায় পরিবার। সম্প্রতি আবার অসুস্থ হয়ে নিখোঁজ হয়ে যান ওই নারী।

আমার স্ত্রীকে নিয়ে আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। এবার প্রায় দুই মাস ২৩ দিন তাঁকে খুঁজেছি। কোথায় খুঁজিনি? আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, বিভিন্ন জায়গা—সবখানে খুঁজেছি। তাঁকে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় ছিলাম।
আলী হোসেন, নিখোঁজ নারীর স্বামী

পরিবার সূত্রে জানা যায়, আলী হোসেন ও আলেয়া দম্পতির তিন সন্তান। বড় ছেলে ২৩ বছর বয়সী এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আট বছর বয়সী আরেক ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে।

এবার নিখোঁজের পর নিজের নাম-ঠিকানা পর্যন্ত ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না আলেয়া। এ সময় সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামের রাস্তার পাশে দিন কাটাচ্ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কয়েক দিন ধরে তাঁকে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখেন। কখনো মানুষের কাছে খাবার চাইতেন, আবার কখনো রাস্তার পাশে বসে থাকতেন।

বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হকের। তিনি আলেয়ার অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরে একটি ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ভিডিওটি পৌঁছে যায় আলী হোসেনের কাছেও। তিনি নিশ্চিত হন ভিডিওতে থাকা ওই নারী তাঁর স্ত্রী। এরপর ভিডিওতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দ্রুত গোবিন্দল এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে আলেয়াকে দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আলী হোসেন বলেন, ‘ভিডিওতে স্ত্রীকে দেখার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। দ্রুত সেখানে (গোবিন্দল) চলে যাই। কাছে গিয়ে দেখি, সত্যিই আমার স্ত্রী। আমাকে দেখেই সে চিনতে পারে। এত দিনের কষ্ট যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। আমি তাঁকে ফিরে পেয়েছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হকের। তিনি আলেয়ার অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরে একটি ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পেশায় দরজি আলী হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। এবার প্রায় দুই মাস ২৩ দিন তাঁকে খুঁজেছি। কোথায় খুঁজিনি? আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, বিভিন্ন জায়গা—সবখানে খুঁজেছি। তাঁকে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় ছিলাম।’

আলেয়া এখন মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থ বলে জানান তাঁর স্বামী, তবে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুর্বলতার কারণে তাঁকে সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।