Association for Asian Studies-এর সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোরে গিয়েছিলাম। সফর মাত্র চার দিনের; কিন্তু অভিজ্ঞতা যেন হাজারো। এই অল্প সময়ে দেখা পাকিস্তান আমার অনেক পূর্বধারণাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
১. বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা:
NTU Reception-এ একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় হলো। "আমি বাংলাদেশি", এ কথা বলতেই প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “We love Bangladesh!” প্রথমে ভেবেছিলাম, এটি হয়তো নিছক সৌজন্য। কিন্তু কথোপকথন যত এগোল, ততই মনে হলো: কথাগুলো তারা হৃদয় থেকেই বলছে।
এর আরও আবেগঘন প্রমাণ পেলাম একজন শিক্ষকের কাছ থেকে। আমি বাংলাদেশি জেনে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং আবেগে কেঁদে ফেললেন। আরেকজন শিক্ষার্থী কিছুটা সংকোচ ও বেদনা নিয়ে প্রশ্ন করল, “আপনারা কি এখনো আমাদের ঘৃণা করেন?”
প্রশ্নটির মধ্যে ইতিহাসের ভার ছিল, অপরাধবোধ ছিল, আবার নতুনভাবে কাছে আসার আকুতিও ছিল।
১৯৭১-এর ইতিহাস, গণহত্যা ও বাংলাদেশের মানুষের গভীর ক্ষত কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। ইতিহাসের সত্য স্বীকার ও ন্যায়বিচারের দাবি অটুট রেখেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছি; কিন্তু এত আন্তরিক, অতিথিপরায়ণ ও সহজে আপন করে নেওয়া মানুষ খুব কমই দেখেছি। আমার ব্রিটিশ, সিঙ্গাপুরীয় ও চীনা সহকর্মীদের অভিমতও প্রায় একই।
২. উচ্চশিক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি:
পাকিস্তানের অনেক ইতিবাচক দিকই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।
আমি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেছি: Lahore University of Management Sciences (LUMS), FAST National University এবং University of the Punjab। প্রতিটি ক্যাম্পাসই ছিল পরিপাটি, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় গবেষণা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক যোগাযোগের প্রতিও তাঁদের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
University of the Punjab-এর বিস্তৃত ক্যাম্পাস বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। প্রায় ১,৮০০ একরের এই ক্যাম্পাসটি আয়তনের দিক থেকে আমার দেখা বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর একটি। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমাদের আরও জানার এবং দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
৩. মুসলিমপ্রধান সমাজের ভেতরে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য:
পাকিস্তান মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও এর সমাজ ও সংস্কৃতি মোটেও একমাত্রিক নয়। পাঞ্জাবি ঐতিহ্যের পাশাপাশি পশতুন, সিন্ধি, বালুচ, কাশ্মীরি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিচয়ের মানুষের উপস্থিতি দেশটির সাংস্কৃতিক জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঐতিহ্যবাহী শালওয়ার-কামিজের পাশাপাশি আধুনিক পোশাক; উর্দু, পাঞ্জাবি ও ইংরেজির স্বচ্ছন্দ ব্যবহার; ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার সহাবস্থান লক্ষ করেছি। লাহোরের মসজিদ, গুরুদ্বার, মন্দির, গির্জা, সুফি দরবার ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্য এই ভূখণ্ডের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
এখানকার সংস্কৃতিতে ইসলামি পরিচয় যেমন গভীর, তেমনি পাঞ্জাবি প্রাণচাঞ্চল্য, সুফি মানবিকতা এবং উপমহাদেশীয় ঐতিহ্যের প্রভাবও প্রবল।
৪. জীবন্ত ইতিহাস ও অসাধারণ স্থাপত্য:
লাহোরে ইতিহাস শুধু জাদুঘরে বন্দি নয়; শহরের অলিগলি, প্রাচীর, দরজা, মসজিদ ও প্রাসাদের মধ্যে তা আজও জীবন্ত।
দিল্লি গেট, ওয়াজির খান মসজিদ, শাহী হাম্মাম, লাহোর ফোর্টের শীশমহল এবং বাদশাহী মসজিদ--প্রতিটি স্থাপনা মুঘল আমলের নান্দনিকতা, প্রকৌশলদক্ষতা ও নগর-পরিকল্পনার বিস্ময়কর সাক্ষ্য। ইট, পাথর, আয়না, ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা ও রঙিন কাশিকারি শিল্পের সমন্বয় দেখে বারবার মনে হয়েছে: সৌন্দর্য তখন কেবল রাজপ্রাসাদে নয়; ধর্মীয় ও জনপরিসরেও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল।
৫. খাবার, প্রাণচাঞ্চল্য ও আতিথেয়তার শহর:
লাহোরের খাবারের কথা না বললে অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কাবাব, কড়াই, বিরিয়ানি, নান, লাচ্ছি—প্রতিটি খাবারেই স্বাদ ও ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়। তবে খাবারের চেয়েও বেশি মনে থাকবে মানুষের আন্তরিকতা। দোকানদার, শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা সাধারণ পথচারী—বাংলাদেশের কথা শুনলেই তাঁদের চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস দেখেছি, তা সত্যিই স্পর্শকাতর।
অবশ্যই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও নানা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু একটি দেশকে শুধু তার সংকট কিংবা সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক শিরোনাম দিয়ে বিচার করলে তার মানুষ, সম্ভাবনা, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির বড় অংশই অদেখা থেকে যায়।
চার দিনের সফর আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে: রাষ্ট্রের ইতিহাস জটিল হতে পারে, রাজনীতি বিভাজন তৈরি করতে পারে; কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সৌহার্দ্য, অনুশোচনা, ভালোবাসা ও পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা বেঁচে থাকে।
লাহোর থেকে ফিরলাম কিছু সুন্দর স্মৃতি, কিছু কঠিন প্রশ্ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে আরও বেশি সংলাপ, সহযোগিতা ও হৃদ্যতার গভীর প্রত্যাশা নিয়ে।













মাশাল্লাহ!