সিলেটের দরগার রোড থেকে বাইকে রাইড শেয়ার করে কদমতলী থেকে এসেছেন এক যাত্রী। তার দাবি, ১০০ টাকার বেশি এক টাকাও ভাড়া বেশি দিতে পারবেন না তিনি। তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই রাইডার নাজিম উদ্দিন শিকদার তার বাইকে রাইড শেয়ার করে নিয়ে আসা যাত্রীকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন তেলের দাম বেড়েছে। তাই তিনি এখন ২০ টাকা বেশি দাবি করছেন।
যাত্রীর সাথে তর্ক-বিতর্ক আর বাগবিতণ্ডা শেষে রাইডার নাজিম উদ্দিন শিকদার চরচাকে বলেন, ‘‘রাইড শেয়ার করে পরিবার চালাতে হয়। কিন্তু সরকার যেভাবে তেলের দাম বাড়িয়েছে এতে চলা এখন মুশকিল।”
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত সাত মাসে মোট তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল প্রথম দফায় ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা করা হয়।
পরে ১ জুন দ্বিতীয় দফায় ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত থাকলেও কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৪৫ টাকা করা হয়।
সবশেষ ২১ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফায় ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
সিলেটের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও নতুন দামে কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক ভোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু যানবাহনের খরচে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও।
সিলেটের জিন্দাবাজারের সিটি সেন্টারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী মিনহাজ আহমেদ চরচাকে বলেন, “দেশে সংকট থাকলেও সরকারের এভাবে হুট করে ২০ টাকা দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। ৫-৬ টাকা হলে মানা যেত। এখন এই দাম বাড়ায় যাতায়াত খরচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অটোমেটিকভাবে বাড়তে পারে।”
কাপড়ের দোকানের কর্মচারী মিসবাহ বলেন, ‘‘কাজ করে কয় টাকা বেতন পাই। বাইক ছিল, কিন্তু তেলের দাম বাড়ায় এখন ঘরে রেখে দিছি।”
প্রবাস থেকে ফিরে কোন কাজ না পেয়ে মোটরসাইকেল কিনে রাইড শেয়ার করছেন এম ডি মানুনুর রশীদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “নতুন তেলের দামে দুঃখ লাগছ। একজন রাইডার রাইড শেয়ার করে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা রুজিই হতে পারে। কিন্তু ১৬৫ টাকা লিটার তেল কিনে রাইড শেয়ার করে জীবিকা নির্বাহ কষ্টকর।”
সিলেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম মুনিম চরচাকে বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সর্বক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। এই ধরুন আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে যেসব মালামাল পরিবহন করে আনি তার খরচ বাড়ছে। এতে পণ্যের দাম বাড়বে। সরকারের আরও ভাবা উচিত ছিল।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সাধারণ ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে সরকারের প্রতি আবেদন থাকবে দামটা সহনীয় পর্যায়ে রাখার।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, ‘‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে যেটা হয় উৎপাদন খরচ বাড়ে। ফলে দ্রব্যের দাম বাড়ে। এতে সাধারণ লোকজনের ক্রয় ক্ষমতা কমে আসে। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে অর্থনীতির ভাষায় বলা যায়, প্রবৃদ্ধির ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেখা যায়- মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে। একটা সময় দেখা যায় বেকারত্বের হারও বাড়ে এবং একটা পর্যায়ে আমদানি-রপ্তানির ওপরেও এর প্রভাব পড়বে।’’