একসময় মাদারীপুরের চরমুগরিয়া বন্দরের পরিচয় ছিল মুক্তভাবে বিচরণ করা দেড় হাজারের মতো বানর। মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করেই বেড়ে উঠছিল জেলার ঐতিহ্যের এই প্রাণীগুলো। কিন্তু খাবারের সংকট, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং মানুষের সঙ্গে বাড়তে থাকা সংঘাতে এখন হুমকির মুখে তাদের অস্তিত্ব। নানা কারণে কমছে বানরের সংখ্যা। এভাবে চলতে থাকলে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী এই বানরগুলো একদিন হারিয়ে যাবে কি না-এমন প্রশ্নই এখন ঘুরছে সচেতন মানুষের মনে।
জানা গেছে, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতের নদীয়া ও শান্তিপুর থেকে অনেক বানর আসতো এ বন্দর এলাকায়। সেই বানরগুলো স্থায়ীভাবে মাদারীপুরের চরমুগরিয়া এলাকায় থাকতে শুররু করে। ওই সময় কয়েক হাজার বানর থাকলেও প্রকৃতি ও ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে বানরের সংখ্যা কমেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও দেড় হাজারের মতো বানর থাকলেও এখন আর তা নেই। জেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও এখানকার বানরগুলো চলে গেছে।
আগের মতো এই জেলায় ফলজ গাছ না থাকায় চরম খাদ্যভাবে পড়েছে এ বানরগুলো। তবে চরমুগরিয়া বন্দরে কি পরিমাণ বানর আছে তার সঠিক হিসাব নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও মাদারীপুর বন বিভাগ ও পশু সম্পদ বিভাগের মতে, চরমুগরিয়া বন্দরে বর্তমানে এক হাজারের মতো বানর আছে। একটা সময় এই বানরগুলো চরমুগরিয়ায় ছয়টি ভাগে বিভক্ত হয়ে বসবাস করতো। এই স্থানগুলো হলো চরমুগরিয়া এলাকার কালীবাড়ী, জে.টি.সি. থানা বা ফাঁড়ি, জেমস একাডেমি, নদীর পাড় ও জমাদ্দার মিল এলাকা। এখন আর বানরদের তেমন একটা এসব জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
‘বর্তমানে বানরদের খাবারের জন্য সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ নেই। গত বছর বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। তাই বানরগুলো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার বরাদ্দ আসলে বানরদের খাবার দেওয়া হবে। তাছাড়া বানরদের অভয়ারণ্যের জন্য চরমুগরিয়ার নয়াচর এলাকায় ইকোপার্কের কাজটি জমি নিয়ে মামলা থাকায় স্থানীয়দের বাধার মুখে কাজ বন্ধ আছে। ইকোপার্কটি চালু করতে পারলে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়া বানরগুলো এখানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
চরমুগরিয়ায় বসবাসরত স্থানীয়দের মতে, একসময় বানরগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভাগ হয়ে থাকত। একদল থাকত কালীবাড়ীতে, আরেকটি স্বর্ণকারপট্টির একাংশ, চৌরাস্তা ও নদীর পাড়ে; অন্য দল থাকত জেটিসি ও আদমজী এলাকায়। এক এলাকার বানর সাধারণত অন্য এলাকায় প্রবেশ করত না। ভুল করে কোনো বানর অন্য দলে ঢুকে পড়লে দুই দলের মধ্যে লড়াই বা সংঘর্ষ বেঁধে যেত। তবে সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। খাদ্যসংকটের কারণে বানরগুলো ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও খাবারের দোকানে হানা দিচ্ছে তারা। খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতায় কমছে বানরের সংখ্যাও।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বানরগুলোর সুরক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় মাদারীপুর থেকে হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহ্যবাহী এই প্রাণীগুলো।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় এখানকার বানররা বিপন্ন হয়ে পড়ে। তখন এখানকার বেশ কিছু বানর মারা যায়।
১৯৯৮ এর বন্যার সময় নবী সাহেব নামক এক জুট অফিসার দীর্ঘদিন এদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি প্রাক্তন জেলা প্রশাসক ফরহাদ রহমানের গোচরীভূত হলে তিনি সাবেক পরিবেশ মন্ত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে বানরকুল রক্ষার আবেদন জানান। মন্ত্রী তখন বানভাসি মানুষের পাশাপাশি বানরদের জন্য ত্রাণ মঞ্জুর করেন।
‘দিন দিন এই বানরগুলো খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। আবার অনেক বানর আশে পাশের জেলাগুলোতে চলে যাচ্ছে। বানরগুলোর অত্যাচারের আমরা অতিষ্ঠ। ওদের কারণে আমরা ব্যবসা ঠিকমতো করতে পারি না। এক পলকের মধ্যে ছো মেরে খাবার নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় ওদের অত্যাচারের বানরগুলোক লাঠি দিয়ে মেরে তাড়াতে হয়। তাই এদের সঠিকভাবে খাদ্যের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সাল থেকে আবার খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ২০০৩ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর প্রায় প্রতি শুক্রবার ফ্রেন্ডস অব নেচার নামে এক সংগঠন বানরদের খাদ্য বিতরণ করে আসছিল। তারই পাশাপাশি ২০০৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেসিডিপি নামে একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মজিবুল হক দুলু প্রতিদিন ৫০০ টাকার খাদ্য বানরদের জন্য বিতরণ করেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০০৬ সালে বন বিভাগ থেকে ১ কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তার মধ্যে প্রতিদিন বানরকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে খাদ্য বিতরণ এবং বানরদের থাকার জন্য স্থায়ী শেড নির্মাণ ও বিভিন্ন প্রকারের ফলফলাদির গাছ লাগানোর ব্যবস্থা ছিল। পরে ২০০৮ সালে বানরদের জন্য ৫ লাখ টাকার একটি শেড নির্মাণ কাজ হয়। তবে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গাছ লাগানো হলেও গাছগুলো সংরক্ষণের অভাবে মারা যায়।
পরবর্তীতে আবারও দুইবার বানরদের জন্য বরাদ্দ আছে। এরপর দীর্ঘদিন সরকারিভাবে কোনো খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় নতুন জন্ম নেওয়া বানরের বাচ্চাগুলোসহ অন্য বানরগুলোও মারা যায়। অনেক বানর খাদ্যের অভাবে জেলার বাহিরেও চলে যায়। এরপর ২০২২ সালে সরকারিভাবে বানরের খাবার দেওয়ার জন্য ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। সর্বশেষ ২৩ লাখ টাকার বরাদ্দ আসে। তাও গত বছর বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। এরপর থেকে বানরদের খাদ্য অভাব চরম আকার ধারণ করে। এদিকে মাদারীপুর বন বিভাগ চরমুগরিয়া এলাকার নয়াচরে একটি ইকোপার্ক তৈরি করা করছে। বর্তমানে জমি নিয়ে মামলার জটিলতার করণে কাজ বন্ধ আছে। এই ইকোপার্কের একপাশে বানরগুলোর জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে কিছুটা হলেও বানরদের অস্তিত্ব রক্ষা পাবে।
‘প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া বানরগুলো আজ খাদ্যের অভাবে বিলুপ্তির পথে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য সরকারসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত ইকোপার্কটি চালু করে বানরদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে আমাদের জেলা থেকে মুক্তিভাবে বেড়ে ওঠা এই বানরগুলো বিলুপ্তি হয়ে যাবে।’
মাদারীপুরের স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অব নেচারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া বানরগুলো আজ খাদ্যের অভাবে বিলুপ্তির পথে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য সরকারসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত ইকোপার্কটি চালু করে বানরদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে আমাদের জেলা থেকে মুক্তিভাবে বেড়ে ওঠা এই বানরগুলো বিলুপ্তি হয়ে যাবে।
মাদারীপুর চরমুগরিয়া এলাকা বাসিন্দা সুমন হোসেন বলেন, কয়েক মাস আগেও চরমুগরিয়া এলাকায় অনেক বানর ছিল। খাদ্যের অভাবে বানর শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। খাদ্যের অভাবে দিনে দিনে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী বানররা হারিয়ে যেতে বসেছে।
চরমুগরিয়া এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, দিন দিন এই বানরগুলো খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। আবার অনেক বানর আশে পাশের জেলাগুলোতে চলে যাচ্ছে। বানরগুলোর অত্যাচারের আমরা অতিষ্ঠ। ওদের কারণে আমরা ব্যবসা ঠিকমতো করতে পারি না। এক পলকের মধ্যে ছো মেরে খাবার নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় ওদের অত্যাচারের বানরগুলোক লাঠি দিয়ে মেরে তাড়াতে হয়। তাই এদের সঠিকভাবে খাদ্যের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
মাদারীপুর বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে বানরদের খাবারের জন্য সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ নেই। গত বছর বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। তাই বানরগুলো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার বরাদ্দ আসলে বানরদের খাবার দেওয়া হবে। তাছাড়া বানরদের অভয়ারণ্যের জন্য চরমুগরিয়ার নয়াচর এলাকায় ইকোপার্কের কাজটি জমি নিয়ে মামলা থাকায় স্থানীয়দের বাধার মুখে কাজ বন্ধ আছে। ইকোপার্কটি চালু করতে পারলে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়া বানরগুলো এখানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।