Image description

২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের ঘটনা। ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা।

হাতুড়ি, লাঠি ও দেশি অস্ত্রসহ ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ভবন। টানা তিন ঘণ্টার এই ধ্বংসযজ্ঞ অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে দেখলেও মুখ খুলতে নারাজ। এ ঘটনায় স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের সম্পৃক্তার অভিযোগের ফলে সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও কথা বলতে রাজি হননি স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেকেই।

‘কয়েকজন দোকানিকে ফোনে দোকান সরিয়ে নিতে বলা হয়’

স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার বলেন, এই হামলা ভাঙচুরের ঘটনার আগেই বেশ কয়েকজন দোকানিকে ফোনে দোকান সরিয়ে নিতে বলা হয়। ফোন পেয়ে দোকান সরিয়ে নেওয়ার পরেই শুরু হয় ভাঙচুর-লুটপাটের তাণ্ডব।

স্থানীয়রা বলছেন, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনা এবারই প্রথম হলেও এই জমি দখলকে কেন্দ্র করে এর আগেও ২০০৯ সালে দখলচেষ্টা করা হয়ছিল।

jagonews24
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মিরপুরের-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।

সরেজমিনে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ঘুরে দেখা যায় সম্পূর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। প্রতিটা কক্ষে চালানো হয়েছে ভাঙচুর। খুলে নেওয়া হয়েছে জানালা-দরজা। হাসপাতালের ফ্লোরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মূল্যবান ওষুধ সামগ্রী ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি।

ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা পাইনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বাইরের আম গাছটিও। ভেঙে ফেলা হয়েছে ডাল-পালা। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হাসপাতালটির সীমানা প্রাচীর।

‘দুইজনকেই জিম্মি করে রাখছিল’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তাকর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘আমাদের এই হাসপাতালটা সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খেলা থাকে। তাছাড়া ৫টার পর সব বন্ধ থাকে। তারপর শুধু ২জন গার্ড ডিউটিতে থাকেন। রাতে আমাদের ২ জন গার্ড ডিউটিতে ছিলেন। তাদের মাইরা-ধইরা বসায় রাখছে। মোবাইল নিয়ে নিছে। দুইজনকেই জিম্মি করে রাখছিল। হামলাকারীরা কাজ শেষ করে যাওয়ার পর এলাকাবাসী ফোন করে গার্ড ইনচার্জকে জানিয়েছে। তারপর আমরা জানতে পেরেছি।’

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালের কোন কিছু বাদ রাখেনি। জানালা দরজা থেকে শুরু করে সব নিয়ে গেছে।’

২০০৯ সালেও ঝামেলা হয়েছিল শোনা যাচ্ছে। তখন কি হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ হয়েছিল। তখনও দখল করতে আসছিল।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি লাগোয়া পান-সুপারির এক দোকানির সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা এত রাতে ওখানে ছিলামও না। আমাদের নাইট গার্ডরা ফোন দিছে। ভাঙচুর করবে, মালামাল সরানোর জন্য। যখন মালামাল সরাতে আসেন। তখন কি দেখলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভেকু নিয়ে আসছিল। আর মালামাল নেওয়ার গাড়ি ওইদিকে ছিল। তখনও এই দিকে তেমন বেশি মানুষ ছিল না। আমার দোকানের মালামাল সরিয়ে রেখে পরিস্থিতি খারাপ দেখে চলে গেছি।’

‘২০০৯ সালেও একবার হয়ছিল’

প্রায় ২০ বছর ধরে এলাকায় ব্যবসা করছেন আরেক দোকানি। এর আগেও এমন কোন ঘটনা ঘটেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০০৯ সালেও একবার হয়ছিল। তখনও দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

 

.jagonews24
 
.jagonews24

 

স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিরপুর এলাকার মানুষের একটা সেবা কেন্দ্র ছিল, এইটা। অধিকাংশ শিশু এইখানে চিকিৎসার জন্য আসতো। অল্প টাকায় চিকিৎসা পেত।

তিনি বলেন, ‘জায়গাটা কিন্তু মূলত হাসপাতালের না। এই জায়গাটার যে মালিক সেই এই জায়গাটা হাসপাতালের কাছে ভাড়া দিয়ে রাখছে। সে অনেকদিন আগে মারা গেছে। তার আত্মিয়-স্বজনদের কাছে নাকি কাগজপত্র সবকিছুই আছে।’

‘তিন ঘণ্টা সময় নিয়ে ভাঙছে’

তিনি বলেন, ‘তিন ঘণ্টা সময় নিয়ে ভাঙছে। দিনে পারবে না বলেই তারা গভীর রাতে আসছে। আজকে যে ভিডিও ফুটেজ দেখলাম তাতে তো পুলিশের গাড়িও দাড়ানো ছিল। আর যে ভেকু নিয়ে আসছে ওইডা তো একমাত্র সরকারি কাজে ব্যবহার করে।’

এরপর হাতে থাকা ফোন বের করে গ্রেফতারকৃত আসামির সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছবি দেখান তিনি। বলেন, ‘দুইজনইতো মহিলা আসনের এই এলাকার, দুইজনই জড়িত।’

‘ভাঙচুরের পরদিন টিনের বেড়া দিয়ে দেওয়ার প্ল্যানি ছিল’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালটির আরেক কর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাঙচুরের পরদিনই এই জায়গা টিনের বেড়া দিয়ে দেওয়ার প্ল্যানি ছিল ওদের। কিন্তু পুলিশ মোতায়েন ছিল এই কারণে দিতে পারেনি। টিনের বেড়া দিতে আসছিল পরে পুলিশ দেখে চলে গেছে।’

প্রত্যক্ষদর্শী মো. আয়ুব বলেন, ‘আমরা দেখছি সব হাতুড়-ছেনি নিয়ে আসছে। তখন আমরা ওইদিকে ছিলাম। আমাদের ওই দিক দিয়ে প্রায় ১৫০-২০০ লোক আসছে। তাদের প্রত্যেকের হাতেই, কারও হাতে শাবল ছিল, কারও হাতে হাতুড়ি ছিল। পরে আমরা চলে গেছি। রাতেই সব মালপত্র পিকআপ ভরে নিয়ে গেছে।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মধ্যরাতে পুলিশের উপস্থিতিতে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবর-দখলের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রোববার (২৭ রোববার) টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবর-দখলের ঘটনা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর দৃষ্টান্ত।

 

jagonews24
 
jagonews24

 

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এসময় সাংবাদিকরা উল্লেখ করেন, যখন ভাঙচুর করা হয়েছে, সে সময় পুলিশ উপস্থিত ছিল। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। এ ধরনের একটি ঘটনা রোধ করা অবশ্যই পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা দেখছি পুলিশের এই ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা ছিল কি না। পুলিশ জানার পরও সময়মতো এসেছিল কি না এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা আছে কি না, সবকিছু দেখা হবে।’ মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এ ঘটনায় এরই মধ্যে দারুসসালাম এলাকার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশের কোনো সদস্যের যদি অবহেলা বা গাফিলতি থাকে, তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, মিরপুরের স্বাস্থ্য কেন্দ্র ‘রাড্ডায়’ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপি এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির লুণ্ঠিত দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

 

শাহ আলী থানার ওসি প্রত্যাহার

এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শাহ আলী থানার নতুন ওসি হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক মো. রাজীব হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া আরও চার থানার পরিদর্শককে (অপারেশন ও তদন্ত) বদলি করা হয়েছে।