Image description

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে মরহুম ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের "Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics"। লেখক নিজে এই প্রকাশনা দেখে যেতে পারেননি; ২০২৫ সালের ৪ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাঁকে মাগফিরাত দান করুন। তিন দশকেরও বেশি সময় জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত থাকা, দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনকারী, দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের প্রধান ডিফেন্স কাউন্সেল হিসেবে কাজ করা একজন মানুষের এই মরণোত্তর আত্মকথন তাই কেবল একটি বই নয়; এটি একটি যুগের সাক্ষ্য।
একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ
এই বই আমার কাছে কেবল একটি পর্যালোচনার বিষয় নয়। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ছিলেন আমার গভীর শ্রদ্ধার মানুষ, এবং তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত ও আন্তরিক। একাধিকবার তাঁকে আমার অতিথি হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই দিনগুলোর দীর্ঘ আলাপে আমরা ইসলামি আন্দোলনের সংস্কার, নেতৃত্ব তৈরি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অকপটে মত বিনিময় করেছি। অনেক সংস্কার-ভাবনা আমরা একান্তে ভাগ করে নিয়েছি, এবং বহু প্রশ্নে আমাদের চিন্তা মিলে গিয়েছিল। তাঁর বিনয়, আইনের ওপর অসাধারণ দখল, যুক্তির প্রতি নিষ্ঠা এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনার অভ্যাস আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।
তাই এই বই পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, পাতাগুলোর ভেতর থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। যে প্রশ্নগুলো তিনি আমাদের আলাপে তুলতেন, তার অনেকগুলোই এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বইটির প্রকাশনা তিনি দেখে যেতে পারেননি, এই বেদনা আমাকে পীড়া দেয়। এই লেখায় কোথাও কোথাও আমি তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছি, বিশেষত ১৯৭১ প্রশ্নে। সেই দ্বিমত তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি থেকে নয়। তাঁর সঙ্গে আলাপেই শিখেছি যে মতপার্থক্য খোলামেলা আলোচনার বিষয়, সম্পর্ক ছিন্ন করার নয়। এই লেখাকে আমি তাঁর সঙ্গে সেই অসমাপ্ত আলাপেরই ধারাবাহিকতা মনে করি।
বইটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো যখন জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট ও ৬৮টি আসন পেয়ে দলটি এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে জামায়াত এর আগে এমন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বইটি ঘিরে যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে, তা বিস্ময়কর নয়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন এফ. ড্যানিলোভিচ এবং সাংবাদিক কামাল আহমেদ বক্তব্য রেখেছেন। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউনসহ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে; সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা, আর প্রতিচিন্তায় অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন দীর্ঘ গ্রন্থালোচনা। একজন প্রয়াত নেতার বইকে ঘিরে এমন আলোড়নই প্রমাণ করে যে জামায়াত আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
এই আলোচনায় আমি বইটিকেই কেন্দ্রে রাখতে চাই: লেখক কী বলেছেন, কেন বলেছেন, কোথায় তাঁর পর্যবেক্ষণ মূল্যবান, আর কোথায় আমার অবস্থান ভিন্ন। পাশাপাশি অধ্যাপক রীয়াজের বিশ্লেষণকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে চাই। তিনি একজন খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে তিনি একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। একসময় যাঁর পরিচিতি ছিল বামঘেঁষা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে, তাঁর এমন নিবিষ্ট মনোযোগও জামায়াতের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতার আরেকটি স্বীকৃতি। ফলে তাঁর ভাষ্য কেবল বিদ্যায়তনিক নয়, অভিজ্ঞতালব্ধও।
লেখক ও তাঁর প্রেক্ষাপট
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের জীবন নিজেই এক জটিল উপাখ্যান। ১৯৮০ সালে লিংকনস ইন থেকে বারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তিনি দেশের সাংবিধানিক, বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অঙ্গনে প্রথম সারির আইনজীবী হয়ে ওঠেন। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান ডিফেন্স কাউন্সেলের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি দেশ ছেড়ে লন্ডনে চলে যান এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, দুই দশক ধরে তিনি ১৯৭১ প্রশ্নে খোলামেলা আলোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য দলকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন, পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার ও নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের পক্ষে কথা বলেছেন, কিন্তু সফল হননি।
পদত্যাগের পর তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং দলটির প্রধান উপদেষ্টা হন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, দলটি প্রচলিত "ইসলামি রাষ্ট্র" প্রতিষ্ঠার ধারণার বদলে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে কাজ করবে। কিন্তু একটি তথ্য প্রায় সব আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, অথচ আমার বিবেচনায় তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন, কারণ দলটি তার কর্মসূচিতে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতি অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অর্থাৎ যিনি জীবনভর জামায়াতের সংস্কারের কথা বলেছেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত এমন একটি দলের সঙ্গে থাকতে পারেননি যেখানে ইসলামি আদর্শ গৌণ হয়ে পড়ে। সংস্কারের পথে চলতে গিয়ে আদর্শের শিকড় আলগা হলে কী ঘটে, তাঁর জীবনের এই শেষ অধ্যায় যেন সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে আমি পরে ফিরে আসব।
বইয়ের কাঠামো ও কেন্দ্রীয় রোগনির্ণয়
অধ্যাপক রীয়াজ যথার্থই লক্ষ করেছেন যে বইটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম চারটি অধ্যায়ে রয়েছে জামায়াতের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে লেখকের সম্পৃক্ততা, বিতর্ক ও পদত্যাগের বিবরণ। পঞ্চম থেকে সপ্তম অধ্যায়ে লেখক প্রবেশ করেছেন তাত্ত্বিক প্রশ্নে: দ্বীন ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা এবং ইসলামি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কাঠামো।
লেখকের কেন্দ্রীয় রোগনির্ণয় হলো, জামায়াতের নেতৃত্ব বেশ কিছু নীতিগত ভুল ও প্রমাদ করেছে এবং দলটি অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি। তিনি দুটি মৌলিক ঘাটতির কথা বলেছেন, যাকে তিনি নেতৃত্বের ঘাটতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, প্রায় আশি বছরে জামায়াত কেন রাশেদ ঘানুচি, রজব তাইয়েব এরদোয়ান বা আনোয়ার ইব্রাহিমের মতো স্বপ্নদর্শী নেতা তৈরি করতে পারেনি। তাঁর মতে, দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মসূচি নেতা নয়, কর্মী তৈরি করে। প্রকাশকের ভাষ্য অনুযায়ী বইটি দলের একটি মৌলিক বৈপরীত্যকেও সামনে এনেছে: সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী থাকা সত্ত্বেও সীমিত জনসমর্থন। সমাধান হিসেবে তিনি তুরস্কের একেপি, তিউনিসিয়ার আন-নাহদা এবং মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির অভিজ্ঞতার আলোকে দাওয়াহ ও রাজনীতিকে পৃথক করার একটি কাঠামোগত রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন।
এই রোগনির্ণয়ের অনেকটাই আন্তরিক বিবেচনার দাবি রাখে। নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিসর, নারীর অংশগ্রহণ কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ভাষা নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলো একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রশ্ন, এবং সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়। ডেভিড বার্গম্যান যেমন উল্লেখ করেছেন, অস্তিত্বের সংকটের এই রায় লেখক সম্ভবত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগেই লিখেছিলেন। তার পরের দুই বছরে জামায়াত তার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল অর্জন করেছে, এবং তা করেছে লেখকের প্রস্তাবিত কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়াই, ১৯৭১ প্রশ্নে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ক্ষমাপ্রার্থনা ছাড়াই। এ থেকে অন্তত এটুকু বলা যায় যে দলের টিকে থাকা ও বিকাশের জন্য আদর্শিক রূপান্তর কিংবা ক্ষমাপ্রার্থনাই একমাত্র পথ ছিল না। জনগণ দলটিকে বিচার করেছে দুঃসময়ে তার দৃঢ়তা, ত্যাগ ও বর্তমান ভূমিকা দিয়ে।
দ্বীন ও রাষ্ট্র: বইয়ের তাত্ত্বিক প্রশ্ন
বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে লেখক তিনটি প্রশ্ন তুলেছেন: শরিয়াহ বাস্তবায়ন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজনীয় কি না; খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা কি না; এবং ইসলামি রাষ্ট্র লক্ষ্য না উপায়। সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী, হাসান আল বান্না, সাইয়িদ কুতুব ও মুহাম্মদ আসাদের চিন্তা আলোচনার পর শায়খ ইউসুফ আল-কারযাভী, হাশিম কামালী, আলী আবদুর রাজিক, আবদুল্লাহি আন-নাঈম ও রাশেদ ঘানুচির চিন্তার আলোকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই, এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন রাষ্ট্রের ধারণাকে অলীক বলার দিকেই তিনি ঝুঁকেছেন। আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তিনি ঘানুচির "মিনিমাল স্টেট" ধারণার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে ন্যায়ের খাতিরে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। ব্যারিস্টার রাজ্জাক ইসলাম ও রাজনীতির অবিচ্ছেদ্যতাকে অস্বীকার করেননি। তিনি রাষ্ট্রের মাধ্যমে "ওপর থেকে" ইসলাম প্রতিষ্ঠার বদলে সমাজের ভেতর থেকে ইসলামি জাগরণের কথা বলেছেন, এবং অধ্যাপক খুরশিদ আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে দাওয়াহ ও রাজনীতি একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে মূল বিরোধ লক্ষ্যে নয়, অনেকাংশে পদ্ধতিতে। এই পার্থক্য মনে রাখলে আলোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হয়।
অধ্যাপক রীয়াজ এই অংশের আলোচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করেছেন। তাঁর মতে ইবনে তাইমিয়া, মুহাম্মদ আবদুহু ও রশিদ রিদার রাষ্ট্রচিন্তা আলোচনার বাইরে থেকে যাওয়া বইটির একটি সীমাবদ্ধতা, এবং বান্না ও কুতুবের চিন্তায় লেখক যে নমনীয়তা দেখেছেন, তাঁর পাঠ তার চেয়ে ভিন্ন। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতি করতে হলে প্রথমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে অবদান রাখতে হবে এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করতে হবে। তিনি এও লক্ষ করেছেন যে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড সে দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি, আর এই পার্থক্য বইয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, এবং নিচে আমি সে বিষয়ে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করছি।
আকিদা: যে ভিত্তি অপরিবর্তনীয়
প্রশ্নগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের কাছে এগুলো তুলনামূলক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়, আকিদার প্রশ্ন। ইসলাম কোনো খণ্ডিত আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আল-কুরআন ঈমানদারদের পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:২০৮), দ্বীনের পূর্ণতার ঘোষণা দিয়েছে (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩), এবং নবীদের পরম্পরায় দ্বীন কায়েম করার ও তাতে বিভেদ সৃষ্টি না করার নির্দেশ দিয়েছে (সূরা আশ-শূরা, ৪২:১৩)। ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনা পর্যন্ত জীবনের কোনো অংশকে আল্লাহর বিধানের বাইরে রাখার সুযোগ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নেই। ইসলাম ও রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্যতা ইসলামি আন্দোলনের কাছে কোনো কৌশলগত অবস্থান নয়; এটি ঈমানের অংশ।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও একই কথা প্রযোজ্য। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, আর মানুষ পৃথিবীতে তাঁর খলিফা ও আমানতদার। কিন্তু এর অর্থ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা আলেমসমাজের স্বেচ্ছাচারী শাসন নয়। পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সামষ্টিক বিষয় পরিচালনা (সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩৮), শাসকের জবাবদিহি এবং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্যেরই অংশ। ফলে শাসক নির্বাচন ও অপসারণে জনগণের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং আল্লাহর সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্বের মধ্যে ইসলামি আন্দোলন কোনো বিরোধ দেখে না। বিরোধ দেখা দেয় কেবল তখনই, যখন জনগণের সার্বভৌমত্বের নামে আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণার দাবি ওঠে। অধ্যাপক রীয়াজের আহ্বানের জবাব তাই আকিদা ত্যাগে নয়, বরং আকিদার এই সুসংহত ব্যাখ্যা জাতির সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপনে।
এ কারণেই আমি মনে করি, কোনো পরিস্থিতিতেই একটি ইসলামি আন্দোলন সুপ্রতিষ্ঠিত আকিদা থেকে বিচ্যুত হতে পারে না। রাজনৈতিক চাপ, নির্বাচনী হিসাব, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রশংসা, কোনোটিই আকিদার সঙ্গে আপসের যুক্তি হতে পারে না। যে আন্দোলন আকিদার প্রশ্নে ছাড় দেয়, সে হয়তো সাময়িকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, কিন্তু তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে যায়। তখন সে আর ইসলামি আন্দোলন থাকে না; অন্য দশটি রাজনৈতিক দলের মতো একটি দলে পরিণত হয়, যার অস্তিত্বের আলাদা কোনো নৈতিক যুক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি এখানে স্মরণযোগ্য: যে দলে ইসলামি মূল্যবোধ জায়গা পায়নি, সেখানে তিনিও থাকতে পারেননি।
সুতরাং দ্বীন ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কিংবা ইসলামি শাসনের প্রয়োজনীয়তার মতো প্রশ্নের মীমাংসা কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাহর সর্বজনস্বীকৃত আকিদার আলোকেই হতে হবে। এসব প্রশ্নে আমাদের চূড়ান্ত মানদণ্ড কোনো ব্যক্তির মতামত নয়, তিনি ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মতো প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় মানুষ হোন কিংবা অধ্যাপক রীয়াজের মতো খ্যাতিমান গবেষক; চূড়ান্ত মানদণ্ড কুরআন ও সুন্নাহ। তবু তাঁদের মতামতের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, কারণ তাঁদের প্রশ্নগুলো আমাদের নিজেদের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট ও যুক্তিনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনের তাগিদ দেয়, এবং আলোচনা ও ইজতিহাদের নতুন দুয়ার খুলে দেয়।
ইজতিহাদ: নতুন যুগ ও সন্ধিক্ষণের প্রশ্নে চিরন্তন আমানতের জবাব
আকিদায় অবিচল থাকা মানে স্থবির হয়ে থাকা নয়। ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে যা স্থির (সাওয়াবিত) এবং যা পরিবর্তনশীল (মুতাগাইয়িরাত), তার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আকিদা ও দ্বীনের মৌলিক বিধান স্থির; কিন্তু সেই বিধান বাস্তবায়নের পথ, পদ্ধতি ও কৌশল স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। এই পরিবর্তনশীল পরিসরেই ইজতিহাদের ক্ষেত্র।
ইসলামের ইতিহাস এর সাক্ষী। ইয়েমেনে পাঠানোর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কুরআন ও সুন্নাহয় সমাধান না পেলে তিনি কী করবেন। মুআজ (রা.) নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিলেন, এবং এই প্রসিদ্ধ বর্ণনা ইজতিহাদের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে যুগ যুগ ধরে উদ্ধৃত হয়ে আসছে। খলিফা উমর (রা.) দুর্ভিক্ষের বছরে চুরির হদ্দ কার্যকর করা স্থগিত রেখেছিলেন এবং বিজিত ইরাকের ভূমি যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন না করে রাষ্ট্রের হাতে রেখেছিলেন। এসব সিদ্ধান্তে আকিদা এক বিন্দুও বদলায়নি; বদলেছিল প্রয়োগের কৌশল, শরিয়াহর উদ্দেশ্য বা মাকাসিদ পূরণের লক্ষ্যে।
আজকের ইসলামি আন্দোলনও এমন অসংখ্য নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যা আগের প্রজন্ম কল্পনাও করেনি: বহুদলীয় নির্বাচনী গণতন্ত্র, সাংবিধানিক রাষ্ট্রকাঠামো, বহুধর্মীয় ও বহুমতের সমাজ, রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের অভিঘাত, প্রবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর নতুন প্রশ্ন, এমনকি একটি নতুন প্রজন্মের ভিন্ন রুচি ও ভাষা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ, জোটের রাজনীতি, সাংগঠনিক কাঠামোর সংস্কার, নেতৃত্ব তৈরির পদ্ধতি এবং দাওয়াতের ভাষা ও মাধ্যমের নবায়ন, সবই ইজতিহাদের প্রশস্ত পরিসরের অন্তর্ভুক্ত।
এই আলোকে দেখলে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের অনেক সংস্কার-প্রস্তাবই ইজতিহাদের বৈধ আলোচ্য বিষয়। নেতৃত্ব বিকাশের পদ্ধতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পুনরুজ্জীবন, নারীর পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ, এমনকি দাওয়াহ ও রাজনীতি একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে নাকি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, এগুলো মূলত কৌশল ও সংগঠনের প্রশ্ন। তুরস্ক, তিউনিসিয়া বা মরক্কোর অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার অনেক কিছু আছে। তবে শিক্ষা নিতে হবে কৌশলের স্তরে, আকিদার স্তরে নয়। ইজতিহাদের সীমারেখা এখানেই: কৌশল বদলাতে পারে, বিশ্বাস ও লক্ষ্য নয়। যে ইজতিহাদ আকিদার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা আর ইজতিহাদ থাকে না; তা হয়ে পড়ে আদর্শিক আত্মসমর্পণ।
১৯৭১: বইয়ের ভাষ্য
এবার আসি সেই প্রশ্নে, যা এই বইকে ঘিরে আলোচনার প্রায় পুরোটা দখল করে আছে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক জামায়াতের তিনটি ঐতিহাসিক ভুল চিহ্নিত করেছেন: ১৯৬৬ সালে ছয় দফার বিরোধিতা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন, এবং স্বাধীনতার পর সেই ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়া। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর জামায়াত প্রথমে জনগণের পক্ষেই ছিল; অধ্যাপক গোলাম আযম নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়ে লিখেছিলেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের মজলিসে শূরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা কিংবা সেনা অভিযান, যেকোনো পরিস্থিতিতে জামায়াত কোনো পক্ষকে সমর্থন করবে না; কিন্তু ২৫ মার্চের পর দল সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। সেনাবাহিনীর নৃশংসতা, বিশেষত নারী নির্যাতনের প্রশ্নে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় লিখেছেন যে অন্তত এই একটি কারণেই জামায়াতের উচিত ছিল সেনাবাহিনী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা।
বইয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ সূত্রটি হলো ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য লেখকের বারবার প্রচেষ্টা। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব সুপ্রিম কোর্টে নিশ্চিত হওয়ার পর একটি বক্তব্য প্রস্তুত করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত কেবল অতীতের সম্ভাব্য ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন, যাকে লেখক প্রকৃত ক্ষমাপ্রার্থনা বলে মনে করেননি। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর একটি খসড়া বিবৃতি তৈরি হয়, যাতে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়েছিল। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এর পক্ষে থাকলেও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শেষ পর্যন্ত সম্মত হননি। ২০০৫ সালের অক্টোবরে কর্মপরিষদে প্রস্তাবটি ভোটে নাকচ হয়। ২০১০ সালে কারাগার থেকে কামারুজ্জামানের চিঠি এবং ২০১৬ সালে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদের কাছে পাঠানো লেখকের খসড়া বিবৃতিও একই পরিণতি পায়। লেখকের একটি উল্লেখযোগ্য দাবি হলো, জামায়াত সময়মতো ১৯৭১ প্রশ্নের মুখোমুখি হলে হয়তো আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় যেত না।
অধ্যাপক রীয়াজ এই অংশের ওপর ভিত্তি করে উপসংহার টেনেছেন: "কিন্তু এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা দল এবং দেশের জন্যই দরকার।" প্রকাশনা অনুষ্ঠানেও তিনি একই কথা বলেছেন, এবং বইটিকে জামায়াত নেতৃত্বের জন্য একটি রোডম্যাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই মতের সঙ্গে আমি সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করি। কয়েক দশক ধরে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৯৭১ প্রশ্নকে জামায়াতের একিলিস হিল হিসেবে দাঁড় করানোর যে চর্চা চলে আসছে, এই উপসংহার আমার কাছে তারই প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়েছে।
ক্ষমা কিসের জন্য?
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। নিরীহ মানুষের ওপর হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়ন যে-ই করুক, ইসলামের দৃষ্টিতে তা জঘন্য অপরাধ, এবং তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ নেই, এবং এটিই তাঁর বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। কিন্তু অপরাধের নিন্দা এক জিনিস, আর একটি রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য একটি সংগঠনের ক্ষমাপ্রার্থনা আরেক জিনিস।
লক্ষণীয় যে ডেভিড বার্গম্যান নিজেই দেখিয়েছেন, পুরো বইয়ে কোথাও ব্যারিস্টার রাজ্জাক স্বীকার করেননি যে জামায়াত ১৯৭১ সালে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। তাঁর ২০০১ সালের খসড়াও ছিল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা। তাহলে প্রশ্নটি সরল: ক্ষমা কিসের জন্য? জামায়াত যদি সংগঠন হিসেবে কোনো অপরাধ সংঘটন না করে থাকে কিংবা কোনো অপরাধে অংশ না নিয়ে থাকে, তবে ১৯৭১ সালে তার অবস্থান ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মূল্যায়ন: ভারতের স্বার্থনির্ভর একটি বিভাজন এবং তার ফলে নবগঠিত রাষ্ট্রের ওপর ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা। সেই আশঙ্কা থেকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যদি একটি রাজনৈতিক মত হয়, তবে তা তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটেই যৌক্তিকতা খুঁজে পায়। সেই মতের সঙ্গে কেউ একমত না-ই হতে পারেন; কিন্তু রাজনৈতিক মত পোষণের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোন নীতির মধ্যে পড়ে?
বইটি নিজেই এই অবস্থানের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছে। লেখক জানিয়েছেন, ২০০৫ সালে কর্মপরিষদে যাঁরা ক্ষমাপ্রার্থনার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের যুক্তি ছিল তিনটি: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় অন্যায় কিছু ছিল না; ভারতীয় আধিপত্যের আশঙ্কা ছিল যৌক্তিক; এবং আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা কখনোই কোনো ক্ষমাপ্রার্থনা গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ ক্ষমাপ্রার্থনার বিরোধিতা কোনো পরবর্তীকালের অজুহাত নয়; এটি ছিল দলের সর্বোচ্চ নির্বাহী পর্যায়ের সুচিন্তিত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান। আর তৃতীয় যুক্তিটি যে কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, পরবর্তী দুই দশকের ইতিহাস তার সাক্ষী।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিক কামাল আহমেদ বইয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেখানে একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাকি বলেছিলেন, ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হবে। এমন কথা যদি সত্যিই বলা হয়ে থাকে, তবে আমি তা ভারতীয় আধিপত্যের মতোই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করি। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও তার আদর্শিক ভিত্তির আলোকে, কোনো বিদেশি রাজধানীর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির হিসাবে নয়। ক্ষমাপ্রার্থনার বিরুদ্ধে আমার অবস্থান নীতি ও ন্যায়বিচারের ওপর দাঁড়িয়ে, কারও মনোরঞ্জনের ওপর নয়।
আইন পেশার একজন মানুষ হিসেবে আরেকটি মৌলিক নীতির কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। ফৌজদারি দায় ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলে তার দায় সেই ব্যক্তির; একটি সংগঠন বা তার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর সেই দায় চাপিয়ে দেওয়া আধুনিক আইনশাস্ত্র ও ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থী। আল-কুরআনও একই নীতি ঘোষণা করেছে: কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না (সূরা আল-আনআম, ৬:১৬৪)। অভিযোগ আর প্রমাণ যে এক নয়, তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এটিএম আজহারুল ইসলামের খালাস। আজ যাঁরা জামায়াতের নেতৃত্বে ও কর্মী হিসেবে আছেন, তাঁদের বিপুল অংশের জন্মই ১৯৭১-এর পরে। যে কাজ তাঁরা করেননি, এবং যাতে সংগঠনের অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত বলে তাঁরা মনে করেন না, তার জন্য তাঁদের কাছে ক্ষমা দাবি করা ন্যায়বিচারের কোন মানদণ্ডে যুক্তিসংগত? লেখকের এই অনুমানের সঙ্গেও আমি একমত হতে পারি না যে সময়মতো ক্ষমা চাইলে ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া এড়ানো যেত। আমার আশঙ্কা, সেই ক্ষমাপ্রার্থনাই বরং আদালতে ও রাজনীতির মাঠে স্বীকারোক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ক্ষমা চাওয়া হয়েছে, তবু একিলিস হিল রয়ে গেছে
আমার মূল যুক্তিটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক অনুমান নয়; সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহই তা প্রমাণ করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে দলের কোনো ভুল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন। ২০২৫ সালের মে মাসে এটিএম আজহারুল ইসলামের খালাসের পর তিনি দল বা তার কোনো কর্মীর কারণে যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তাদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। একই বছরের ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ১৯৪৭ সাল থেকে সেদিন পর্যন্ত জামায়াতের কারণে যে কেউ কষ্ট বা ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ব্যক্তি হোক বা সমগ্র জাতি, তাঁদের কাছে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।
তারপর কী ঘটল? সমালোচকেরা এই ক্ষমাপ্রার্থনাকে অস্পষ্ট ও অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন; প্রশ্ন তুলেছেন, এতে নির্দিষ্ট অপরাধের স্বীকৃতি নেই কেন। আর প্রায় এক বছর পর, এই বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানেই আইনমন্ত্রী বলেছেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করলে জামায়াতকে ঘিরে অনেক প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যেত। তিনি আরও দাবি করেছেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের সংশোধনীতে "তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী" শব্দগুচ্ছ রাখার বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে তার ১৯৭১ সালের ভূমিকা মেনে নিয়েছে। অধ্যাপক রীয়াজ বলেছেন, ক্ষমাপ্রার্থনা অপরিহার্য। ডেভিড বার্গম্যান প্রশ্ন তুলেছেন, এই অতীত আগামী দিনেও জামায়াতের একিলিস হিল হয়ে থাকবে কি না।
অর্থাৎ ক্ষমা চাওয়া হয়েছে, এবং তারপরও দাবি থামেনি। প্রথমে দাবি ছিল ক্ষমাপ্রার্থনার; ক্ষমা চাওয়ার পর দাবি উঠল আরও সুনির্দিষ্ট ক্ষমাপ্রার্থনার; তারপর আসবে নির্দিষ্ট অপরাধের স্বীকৃতির দাবি, এবং তারপর আরও কিছু। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গোলাম আযমের বক্তব্যও একই কারণে অপর্যাপ্ত বিবেচিত হয়েছিল, স্বয়ং ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কাছেও। যে গোলপোস্ট প্রতিবার সরে যায়, সেখানে গোল করার চেষ্টা কখনো শেষ হয় না।
এখন দুটি সম্ভাবনা বিবেচনা করা যাক। প্রথমত, রাজনৈতিক চাপের মুখে জামায়াত যদি অযৌক্তিকভাবে সুনির্দিষ্ট অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চায়, তবে সমালোচকেরা সেই ক্ষমাকে অপরাধের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করবেন। তারপর আসবে পরবর্তী দাবি: দল নিষিদ্ধের দাবি, নতুন বিচারের দাবি, ক্ষতিপূরণের দাবি, নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি। অন্যদিকে দলের নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ একে দেখবেন চাপের কাছে নতিস্বীকার হিসেবে, যা অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নৈতিক মনোবলে গভীর ফাটল ধরাতে পারে। দ্বিতীয়ত, জামায়াত যদি সেই চাপ অতিক্রম করে ক্ষমাপ্রার্থনা থেকে বিরত থাকে, তাহলেও ১৯৭১ প্রশ্ন সমালোচকদের হাতে প্রধান অস্ত্র হিসেবেই থেকে যাবে।
অর্থাৎ জামায়াত চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অযৌক্তিক ক্ষমা চাক, কিংবা চাপ অতিক্রম করে ক্ষমাপ্রার্থনা থেকে বিরত থাকুক, দুই ক্ষেত্রেই ১৯৭১ জামায়াতের একিলিস হিল হয়েই থাকবে। কারণটি সহজ: জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ ছাড়া অভিযোগের আর কোনো শক্ত ভিত্তি যখন অবশিষ্ট নেই, তখন প্রতিপক্ষ স্বেচ্ছায় সেই একমাত্র অস্ত্র পরিত্যাগ করবে, এমন প্রত্যাশা রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জামায়াতের নিজের ইতিহাসও এর সাক্ষ্য দেয়: ১৯৭৬ সাল থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই বিতর্ক নানা রূপে ফিরে এসেছে, ভাঙন ও পদত্যাগ ঘটিয়েছে, কিন্তু মীমাংসা হয়নি। ব্যারিস্টার রাজ্জাক নিজেও একে একিলিস হিল বলেছেন। কিন্তু যে ক্ষত প্রতিপক্ষ কখনো শুকাতে দেবে না, ক্ষমাপ্রার্থনা তার নিরাময় হতে পারে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাহলে পথ কোথায়?
আমার বিবেচনায় এই প্রশ্নের জবাবও আকিদা ও ইজতিহাদের সেই সীমারেখার মধ্যেই নিহিত। আকিদার প্রশ্নে কোনো আপস নয়, এবং যে দায় প্রমাণিত নয় তার জন্য চাপের মুখে আত্মসমর্পণও নয়। কিন্তু কৌশলের প্রশ্নে ইজতিহাদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার জরুরি। একিলিস হিল যেহেতু থেকেই যাবে, তাই জামায়াতের কাজ হবে সেই দুর্বলতাকে দলের সংজ্ঞা হয়ে উঠতে না দেওয়া। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতি দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার, সংসদে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির দৃষ্টান্ত, জনকল্যাণে দৃশ্যমান অবদান এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশের মধ্য দিয়েই জনগণ দলটিকে তার বর্তমান দিয়ে বিচার করবে, কেবল অতীত দিয়ে নয়। অতীতের প্রশ্ন ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয় হয়ে থাকুক; রাজনীতির মাঠে জামায়াতের জবাব হোক তার কাজ।
একই সঙ্গে একটি বিষয়ে আমি অনেকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, নাকি আমন্ত্রণ সত্ত্বেও তাঁরা আসেননি, তা আমার জানা নেই। তবে দ্বিতীয়টি সত্য হলে তা দুর্ভাগ্যজনক, কারণ আকিদার দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আন্দোলনের সমালোচনাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ের জবাব নীরবতা নয়, বরং যুক্তিনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়া। কোথায় তিনি সঠিক, কোথায় তাঁর বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ, আর কোথায় দল ভিন্নমত পোষণ করে, তা আলোচনার টেবিলে তুলে ধরাই হবে লেখকের প্রশ্ন তোলা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয়ের সবচেয়ে কার্যকর জবাব।
শেষ কথা
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে হারিয়ে আমি হারিয়েছি একজন শ্রদ্ধেয় সুহৃদ ও চিন্তার সহযাত্রীকে। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি যা বিশ্বাস করেছেন, তা অকপটে বলেছেন এবং লিখে গেছেন, তার জন্য তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছে প্রবাসজীবন, দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব এবং নিজের হাতে গড়া সম্পর্কের বিচ্ছেদ দিয়ে। তবু তিনি কখনো তিক্ততায় আশ্রয় নেননি। তাঁর সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁর আন্তরিকতা, সাহস, সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমার অতিথি হয়ে তিনি যে সময়গুলো কাটিয়েছেন, সেই আলাপের স্মৃতি আমার কাছে আমানত হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাঁর সৎকর্মগুলো কবুল করুন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। তাঁর পরিবারকে আল্লাহ সবরে জামিল দান করুন। ভিন্নমত সত্ত্বেও এমন নিবিড় পাঠ ও উদার আলোচনার পরিসর তৈরির জন্য অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ অন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, এবং ধন্যবাদ ইউপিএলকে, যারা বইটি প্রকাশ করে এই আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এ আলোচনা চলুক, বিস্তৃত হোক। আকিদার দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ইজতিহাদের দরজা খোলা রাখলে ভিন্নমতের মুখোমুখি হতে ইসলামি আন্দোলনের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; চিন্তার সংঘাতের মধ্য দিয়েই একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা আসে।
লেখক পরিচিতি
মুহাম্মাদ অহিদুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক বাংলাদেশি-আমেরিকান আইনজীবী। তিনি Summit Law USA-তে করপোরেট, ব্যবসায়িক, বিনিয়োগ, এস্টেট প্ল্যানিং ও অভিবাসন আইন নিয়ে কাজ করেন। হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে এলএলএম ডিগ্রিধারী এই আইনজীবী ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকে (আইএসডিবি) কাজ করার পর ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটিতে (কিউআইএ) লিগ্যাল কাউন্সেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের সামাজিক, নাগরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং তিনি বাংলায় মাঝে মধ্যে লেখালেখি করেন।